আফগানিস্তানে মাদকবিরোধী অভিযান জোরদারের দাবি করছে তালেবান সরকার। এবার দেশটিতে ঐতিহ্যবাহী ও কৃত্রিম—দুই ধরনের মাদক পাচারের জন্য পাকিস্তানের সীমান্তকে দায়ী করেছে তারা। শুধু অভিযোগ তুলেই থামেনি কাবুল; মাদক পাচার বন্ধে ইসলামাবাদকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে এবং পাকিস্তানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টিরও দাবি তুলেছে। অন্যদিকে, আফগানিস্তানে পোস্ত চাষ ও আফিম উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ার তথ্য সামনে এলেও প্রতিবেশী অঞ্চলে পোস্ত চাষ বৃদ্ধির খবর নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
আফগানিস্তানে প্রবেশ করা অধিকাংশ মাদক পাকিস্তান থেকে পাচার হয়ে আসে বলে দাবি করেছে তালেবান সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এ ধরনের পাচার বন্ধে পাকিস্তানকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে তারা।
তালেবান সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র আবদুল মতিন কানি দলটির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমকে বলেন, পাকিস্তান সীমান্ত দিয়ে আফগানিস্তানে ঐতিহ্যবাহী ও কৃত্রিম—উভয় ধরনের মাদক প্রবেশ করছে। মাদক পাচার প্রতিরোধে তালেবান বাহিনী তাদের অভিযান ও তৎপরতা জোরদার করেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
কানি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, পাকিস্তানের ওপর চাপ সৃষ্টি করা প্রয়োজন, যাতে দেশটি আফগানিস্তানসহ এশিয়ার অন্যান্য দেশে মাদক পাচার বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়।
তবে তালেবানের এসব অভিযোগের বিষয়ে পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষের কোনো প্রতিক্রিয়া এখনো পাওয়া যায়নি।
তালেবানের অভিযোগ এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশের কয়েকটি এলাকায় পোস্ত চাষ বৃদ্ধির খবর পাওয়া যাচ্ছে।
প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানে তালেবান সরকার পোস্ত চাষ নিষিদ্ধ করার পর বেলুচিস্তানের কিছু এলাকায় এই চাষ সম্প্রসারিত হয়েছে। তবে এসব প্রতিবেদনের বিস্তারিত এবং তালেবানের সাম্প্রতিক অভিযোগের সঙ্গে এর সরাসরি যোগসূত্র স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক দপ্তর (ইউএনওডিসি)-এর তথ্য অনুযায়ী, তালেবান সরকারের পোস্ত চাষ নিষিদ্ধ করার পর আফগানিস্তানে আফিম উৎপাদন ব্যাপকভাবে কমেছে।
প্রদত্ত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে আফগানিস্তানে পোস্ত চাষের জমির পরিমাণ ছিল প্রায় ২ লাখ ৩২ হাজার হেক্টর। ২০২৫ সালে তা কমে দাঁড়ায় প্রায় ১০ হাজার ২০০ হেক্টরে।
একই সময়ে আফিম উৎপাদন প্রায় ৬ হাজার ২০০ টন থেকে কমে ২৯৬ টনে নেমে আসে। অর্থাৎ, উৎপাদন কমেছে প্রায় ৯৫ শতাংশ।
২০২২ সাল পর্যন্ত বিশ্বে অবৈধ আফিম উৎপাদনের প্রায় ৮০ শতাংশই আফগানিস্তান থেকে আসত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আফগানিস্তানে পোস্ত চাষ ও আফিম উৎপাদন কমে যাওয়ার পরও মাদক পাচারের উদ্বেগ রয়ে গেছে। তালেবান সরকারের বক্তব্য, তাদের দেশে মাদক উৎপাদন নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি হয়েছে, কিন্তু সীমান্তপথে মাদক প্রবেশ ঠেকাতে প্রতিবেশী দেশগুলোকেও দায়িত্ব পালন করতে হবে।
তবে আফগানিস্তানে পাচার হওয়া মাদকের অধিকাংশই পাকিস্তান থেকে আসে—তালেবানের এই দাবির পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা পরিসংখ্যান এখনো সামনে আসেনি।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, আফগানিস্তানে মজুত থাকা আফিম ২০২৬ সালের শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে উৎপাদন কমলেও মজুত, পাচার ও আঞ্চলিক মাদক সরবরাহের চ্যালেঞ্জ পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
মাদক পাচার নিয়ে তালেবান সরকারের অভিযোগের পর এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে পাকিস্তানের অবস্থান। ইসলামাবাদ এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয় এবং সীমান্তপারের মাদক পাচার রোধে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা বাড়ে কি না, তা দেখার বিষয়।
আপাতত তালেবান সরকার আন্তর্জাতিক চাপের আহ্বান জানিয়েছে। তবে অভিযোগ, পাল্টা বক্তব্য ও যাচাইযোগ্য তথ্যের সমন্বয়েই স্পষ্ট হবে—আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সীমান্তে মাদক পাচারের প্রকৃত চিত্র কতটা উদ্বেগজনক।
























