চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে বেসরকারি খাতে ব্যাংকঋণের প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ১৭ শতাংশে, যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন। এ নিয়ে টানা সাত মাস বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে রয়েছে।
সেপ্টেম্বরে ঋণ প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ৩৪ শতাংশ মূল্যস্ফীতির অর্ধেকেরও কম। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি সমন্বয় করলে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রকৃত প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক অবস্থায় রয়েছে।
নীতিসুদহার কমানোর পরও বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়েনি। বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে গত ৩০ জুলাই বাংলাদেশ ব্যাংক নীতিসুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ নির্ধারণ করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, মার্চে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ। এপ্রিলে তা বেড়ে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং মে মাসে ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশে দাঁড়ায়। জুনে প্রবৃদ্ধি কমে হয় ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। জুলাইয়ে কিছুটা বেড়ে ৪ দশমিক ৬২ শতাংশ এবং আগস্টে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে পৌঁছায়।
ব্যাংকার, অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া মূলত নতুন ঋণের চাহিদা দুর্বল থাকার ইঙ্গিত দেয়। ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। নির্বাচনের সাত মাস পার হলেও দেশে নতুন ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগে প্রত্যাশিত গতি আসেনি।
ব্যবসায়ীদের মতে, দেশে নতুন বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণের অনুকূল পরিবেশ নেই। ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং ভ্যাট-করসংক্রান্ত নানা জটিলতা ব্যবসা সম্প্রসারণে বাধা তৈরি করছে। এ পরিস্থিতিতে আগামী এক বছর নতুন ব্যবসা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেই বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এর মধ্যে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও নতুন করে সংকট দেখা দেওয়ায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
ব্যাংকাররা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ বিতরণে অত্যন্ত সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় ১৫টি অর্থায়ন কর্মসূচি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, “অর্থনীতিতে গতি ফিরলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিও বাড়বে। গত সাত মাসে এমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি, যার ফলে ব্যাংকঋণের চাহিদা বেড়ে যেতে পারে। নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন ও বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো প্রয়োজন। এসব কার্যক্রম বাড়লেই ব্যাংকঋণের চাহিদা বাড়বে।”
তিনি আরও বলেন, “চাহিদা না বাড়লে ব্যাংকঋণও বাড়বে না। বর্তমানে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে নতুন ব্যবসা সম্প্রসারণ হচ্ছে না। একই সঙ্গে পণ্য কেনার খরচও বেড়ে গেছে।”
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) পরিচালক ও সাউদার্ন নিটওয়্যারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমরান কাদের তূর্য বলেন, “বর্তমানে ব্যবসা করার মতো অনুকূল পরিবেশ নেই। ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদহার ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগের জন্য পরিবেশকে নিরাপদ মনে করছেন না।”
তিনি বলেন, “জানুয়ারি থেকে ৪০০টির বেশি কারখানা বন্ধ হয়েছে। আবার সরকারের পক্ষ থেকে বার্তা পাওয়া গেছে, ২০৩০ সালের আগে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। এ অবস্থায় ব্যবসায়ীরা নতুন বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন না।”
ইমরান কাদের তূর্য আরও বলেন, “নতুন করে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ব্যবসার ক্ষেত্রে আরও সমস্যা তৈরি করছে। এর সঙ্গে ভ্যাট ও করসংক্রান্ত জটিলতাও রয়েছে।”
সরকারি ট্রেজারি বিল-বন্ডে ঝুঁকছে ব্যাংকগুলো
বেসরকারি খাতে নতুন ঋণের চাহিদা কম থাকায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। গত দুই-তিন বছরে এসব খাতে ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো এখন ঋণের সুদ থেকে আয়ের তুলনায় ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করে আয় বাড়াচ্ছে। অথচ একসময় ব্যাংকগুলোর আয়ের প্রধান উৎস ছিল ঋণের সুদ। বর্তমানে সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটেছে।
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমছে। এ সময়ে দেশের অনেক বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। যেসব কারখানা চালু রয়েছে, সেগুলোর অনেকটিতে উৎপাদন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো হয়েছে।
জ্বালানিসংকট ও উচ্চ ব্যয়ে চাপে শিল্প খাত
এনআরবিসি ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তৌহিদুল আলম খান বলেন, কাঠামোগত নানা প্রতিবন্ধকতা ও দুর্বল চাহিদার কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশের নিচে নেমেছে, যা তিন দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন।
তিনি বলেন, “দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস ও বিদ্যুৎসংকটের কারণে শিল্পকারখানাগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় উৎপাদন চালাতে পারছে না। অভ্যন্তরীণ ও রপ্তানি বাজারে দুর্বল চাহিদা নতুন বিনিয়োগের আগ্রহ কমিয়ে দিয়েছে। পাশাপাশি বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন সক্ষমতার ব্যবহার কম থাকায় ঋণের প্রয়োজনও কমেছে।”
তিনি আরও বলেন, “একই সঙ্গে ঋণের উচ্চ সুদহার ও বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ বিতরণে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।”
তৌহিদুল আলম খান বলেন, এ পরিস্থিতির অর্থনৈতিক প্রভাব ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। ব্যবসা সম্প্রসারণ থমকে যাওয়া এবং চলতি মূলধনের সীমিত প্রবাহের কারণে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে বেকারত্বও বাড়ছে।
তিনি বলেন, “রপ্তানি বাজারের সীমাবদ্ধতা এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তার কারণে রপ্তানিকারকেরা প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাচ্ছেন। এতে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।”
তার মতে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারে সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন সক্ষমতার ব্যবহার বাড়িয়ে ঋণের প্রকৃত চাহিদা তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি কমার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সুদহার পর্যালোচনা করতে হবে, যাতে আর্থিকভাবে লাভজনক প্রকল্পগুলো আবার ব্যাংকঋণ গ্রহণের উপযোগী হয়ে ওঠে। পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ ও নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে।
তৌহিদুল আলম খান বলেন, “এসব মৌলিক শর্ত নিশ্চিত করা গেলে ব্যাংকগুলো উৎপাদনশীল খাতে মানসম্মত ঋণ সরবরাহ করতে পারবে। এর মাধ্যমে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি আবার টেকসই ধারায় ফিরতে পারে।”
প্রণোদনা প্যাকেজে ঋণ প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা
বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান।
তিনি বলেন, “প্রণোদনা প্যাকেজের আওতায় থাকা ১৫টি অর্থায়ন কর্মসূচি কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারে সহায়তা মিলতে পারে।”
তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ নীতিসুদহারের কারণে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর পক্ষে উল্লেখযোগ্যভাবে কম সুদে ঋণ দেওয়ার সুযোগ সীমিত বলে মনে করেন তিনি।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো প্রচলিত সুদহারের তুলনায় অনেক কম হারে ঋণ দিতে পারে না। কারণ তাদেরও বাণিজ্যিকভাবে টিকে থাকতে হয়।”


















