ঢাকা ১১:০৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৪ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
অক্টোবরে ২ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা  জুলাই-অক্টোবরে রপ্তানি আয় ১৭ বিলিয়ন ডলার, প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ টানা সাত মাস ৫ শতাংশের নিচে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি পোশাক খাতে অস্থিরতা চলতে থাকলে ক্রয়াদেশ কমার আশঙ্কা রপ্তানিকারকদের প্রবাসীদের অ্যাকাউন্ট খোলায় এনআইডির বাধ্যবাধকতা শিথিল ও ঋণসীমা বাড়ানোর প্রস্তাব ব্যাংক এমডিদের চ্যালেঞ্জের মধ্যেও তৈরি পোশাকের ব্যবসা বাড়ছে, তবে মজুরি সবচেয়ে কম বাংলাদেশে মজুরি বোর্ড গঠনের তিন দিন পার হচ্ছে, সভা ডাকার কোনো উদ্যোগ নেই মুকেশ আম্বানি এখন এশিয়ার সেরা ধনী, সম্পদ কত বাড়ল ‘বাংলা কিউআর’ কোডে ব্যক্তিপর্যায়ে লেনদেন, যেভাবে পাবেন নিজের কোড এলপিজির নতুন দাম নির্ধারণ, ১২ কেজির সিলিন্ডার বেড়ে ২২৩ টাকা

সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে মাতারবাড়ীর চেয়ে পায়রায় খরচ দ্বিগুণ

  • আপডেট সময় : ০৯:৩৩:৫১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬
  • ১১ বার পড়া হয়েছে

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমিতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কক্সবাজারের মাতারবাড়ী ও পটুয়াখালীর পায়রায় ১৩০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৫৫৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।

কিন্তু প্রকল্প দুটির ব্যয়ে বড় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। মাতারবাড়ীতে প্রতি মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা স্থাপনে ব্যয় ধরা হয়েছে আট কোটি ৬৪ লাখ টাকা, আর পায়রায় ১৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা। অর্থাৎ পায়রা প্রকল্পে মেগাওয়াটপ্রতি ব্যয় মাতারবাড়ীর তুলনায় প্রায় ৮৪ শতাংশ বেশি। একই খাতে দুই প্রকল্পের ব্যয়ের এই পার্থক্য কেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

প্রকল্প দুটির অর্থায়নেও রয়েছে বিদেশি ঋণের ওপর বড় নির্ভরতা। মোট ব্যয়ের মধ্যে এক হাজার ৩১৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা বিদেশি ঋণ থেকে সংগ্রহের প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকার দেবে ১৫৪ কোটি ৬৯ লাখ টাকা এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর নিজস্ব অর্থায়ন থাকবে ৮৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা। তবে পায়রা প্রকল্পের ঋণদাতা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মাতারবাড়ীতে ৭০ মেগাওয়াট এবং পায়রায় ৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্প দুটি ২০২৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ছাই রাখার জন্য নির্ধারিত এলাকায় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করবে কোল পাওয়ার জেনারেশন কম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিপিজিসিবিএল)। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। এতে ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের (ইআইবি) কাছ থেকে ৫৩২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ঋণ নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

অন্যদিকে পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সীমানার মধ্যে প্রায় ১৭০ একর অব্যবহৃত জমিতে ৬০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব করেছে নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কম্পানি লিমিটেড। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৫৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা।

দুটি প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয়ের হিসাব অনুযায়ী, মাতারবাড়ীতে প্রতি মেগাওয়াট সক্ষমতা স্থাপনে ব্যয় আট কোটি ৬৪ লাখ টাকা হলেও পায়রায় তা ১৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ফলে পায়রায় মেগাওয়াটপ্রতি ব্যয় প্রায় সাত কোটি ২৬ লাখ টাকা বেশি।

প্রকল্প দুটির প্রস্তাবিত অঙ্গভিত্তিক ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, পায়রা ৬০ মেগাওয়াট প্রকল্পে সৌর প্যানেলের জন্য প্রায় ১৯৭ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। বিপরীতে মাতারবাড়ীর ৭০ মেগাওয়াট প্রকল্পে সৌর মডিউল ও ইনভার্টার মিলিয়ে ব্যয় প্রায় ১২০ কোটি টাকা। অর্থাৎ উৎপাদনক্ষমতা কম হলেও পায়রায় এই খাতে প্রায় ৭৭ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ রয়েছে। নির্মাণকালীন ঋণের সুদেও পার্থক্য দেখা যায়। মাতারবাড়ীতে সুদ বাবদ প্রায় ২০ কোটি টাকা ধরা হলেও পায়রায় তা প্রায় ৩৫ কোটি টাকা।

এ ছাড়া পায়রা প্রকল্পে বৈদ্যুতিক সরঞ্জামে প্রায় ১৮৮ কোটি টাকা এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামে প্রায় ২৭৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। মাতারবাড়ীতে বিওপি সরঞ্জামে প্রায় ২৫৯ কোটি, অতিরিক্ত যন্ত্রাংশে ৪১ কোটি এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থায় প্রায় ৮০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। পায়রায় ভূমি উন্নয়ন, সড়ক, নিষ্কাশন ও অন্যান্য স্থাপনায় প্রায় ৮৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।

বেশি ব্যয়ের বিষয়ে জানতে বিদ্যুৎসচিব মিরানা মাহরুখকে ফোন দিলে তাঁর মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা উইংয়ের অতিরিক্ত সচিব নূর মোহাম্মদ কাগজ না দেখে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

মাতারবাড়ী প্রকল্পের জন্য নির্বাচিত জমি মূলত বিদ্যুৎকেন্দ্রের ছাই রাখার কাজে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত ছিল। তবে সিপিজিসিবিএল জানিয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদিত ছাই বিক্রি করা হচ্ছে। ফলে ওই জমি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এ প্রকল্পের সুবিধা হিসেবে বিদ্যমান সুরক্ষা বাঁধ, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং কাছাকাছি বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব সুবিধা কাজে লাগানো গেলে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন কমতে পারে।

পায়রা প্রকল্পের জমিটিও আগে থেকেই এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। তাই নতুন করে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না।

প্রকল্প দুটির লক্ষ্য, বিদ্যমান জমি ও অবকাঠামো ব্যবহার করে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো।

মাতারবাড়ী প্রকল্পের প্রস্তাবে আপাতত ব্যাটারিতে বিদ্যুৎ সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। গত ২১ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত প্রকল্প যাচাই-বাছাই সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা যুক্ত করে নতুন প্রস্তাব তৈরি করতে গেলে বাস্তবায়নে অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে।

সভায় জানানো হয়, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এরই মধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে এবং ইআইবির পরামর্শকরা তা পর্যালোচনা করেছেন। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব এড়াতে আপাতত ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা বাদ দিয়ে এগোনোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

মাতারবাড়ী কেন্দ্রের সৌর প্যানেলের সক্ষমতা হবে ৯০.৮১ মেগাওয়াট-পিক এবং বিকল্প প্রবাহে বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা হবে ৭০ মেগাওয়াট। কেন্দ্রটি থেকে বছরে গড়ে ১১ কোটি ৯২ লাখ ৯০ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের লক্ষ্য রয়েছে।

এর আগে গত ১৩ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় মাতারবাড়ীতে ৭০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাশাপাশি অন্তত ৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

পায়রা প্রকল্পটিকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে অননুমোদিত নতুন প্রকল্পের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগ সম্মতি দিয়েছে। অন্যদিকে মাতারবাড়ী প্রকল্পের প্রস্তাব মূল্যায়ন প্রক্রিয়া শুরুর সুপারিশসহ পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।

এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, মাতারবাড়ী ও পায়রা সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে ব্যয়ের যে অস্বাভাবিক তারতম্য দেখা যাচ্ছে, তা কোনোভাবেই ন্যায্য ও যৌক্তিক নয়। এ ধরনের প্রকল্পের মূলধনী ব্যয় (ক্যাপেক্স) ও পরিচালন ব্যয় (অপেক্স) নির্ধারণে সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড থাকা জরুরি। সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও উপকরণের ব্যয় কাঠামো বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী তৈরি করা উচিত।

তাঁর অভিযোগ, বিগত সরকারের আমলে এ ধরনের মানদণ্ড যথাযথভাবে অনুসরণ না করায় ব্যয়ের অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছিল এবং কাঠামোগতভাবে লুণ্ঠনের পথ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এখনো সেই কাঠামো ভাঙা হয়নি। মাতারবাড়ী ও পায়রা প্রকল্পের ব্যয়ের পার্থক্য তারই প্রতিফলন।

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতেও বড় পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। আগামী এক বছরের মধ্যে ছাদভিত্তিক ব্যবস্থা থেকে চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের যুক্ত করা হচ্ছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় বিনিয়োগকারীরা নিজস্ব অর্থায়নে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করবেন।

সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশল ২০২৬-২০৩০ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। বড় সৌর ব্যবস্থা স্থাপনের সুযোগ বাড়াতে নেট মিটারিং নির্দেশিকা সংশোধনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।

ট্যাগস :

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

জনপ্রিয় সংবাদ

অক্টোবরে ২ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা 

সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে মাতারবাড়ীর চেয়ে পায়রায় খরচ দ্বিগুণ

আপডেট সময় : ০৯:৩৩:৫১ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৬ অক্টোবর ২০২৬

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জমিতে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কক্সবাজারের মাতারবাড়ী ও পটুয়াখালীর পায়রায় ১৩০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৫৫৮ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।

কিন্তু প্রকল্প দুটির ব্যয়ে বড় পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। মাতারবাড়ীতে প্রতি মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা স্থাপনে ব্যয় ধরা হয়েছে আট কোটি ৬৪ লাখ টাকা, আর পায়রায় ১৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা। অর্থাৎ পায়রা প্রকল্পে মেগাওয়াটপ্রতি ব্যয় মাতারবাড়ীর তুলনায় প্রায় ৮৪ শতাংশ বেশি। একই খাতে দুই প্রকল্পের ব্যয়ের এই পার্থক্য কেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

প্রকল্প দুটির অর্থায়নেও রয়েছে বিদেশি ঋণের ওপর বড় নির্ভরতা। মোট ব্যয়ের মধ্যে এক হাজার ৩১৫ কোটি ৮৭ লাখ টাকা বিদেশি ঋণ থেকে সংগ্রহের প্রস্তাব করা হয়েছে। সরকার দেবে ১৫৪ কোটি ৬৯ লাখ টাকা এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর নিজস্ব অর্থায়ন থাকবে ৮৮ কোটি ৩২ লাখ টাকা। তবে পায়রা প্রকল্পের ঋণদাতা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মাতারবাড়ীতে ৭০ মেগাওয়াট এবং পায়রায় ৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্প দুটি ২০২৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

কক্সবাজারের মাতারবাড়ীতে এক হাজার ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ছাই রাখার জন্য নির্ধারিত এলাকায় সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করবে কোল পাওয়ার জেনারেশন কম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিপিজিসিবিএল)। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ৬০৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। এতে ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংকের (ইআইবি) কাছ থেকে ৫৩২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ঋণ নেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

অন্যদিকে পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের সীমানার মধ্যে প্রায় ১৭০ একর অব্যবহৃত জমিতে ৬০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের প্রস্তাব করেছে নর্থ-ওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কম্পানি লিমিটেড। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৫৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা।

দুটি প্রকল্পের প্রস্তাবিত ব্যয়ের হিসাব অনুযায়ী, মাতারবাড়ীতে প্রতি মেগাওয়াট সক্ষমতা স্থাপনে ব্যয় আট কোটি ৬৪ লাখ টাকা হলেও পায়রায় তা ১৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ফলে পায়রায় মেগাওয়াটপ্রতি ব্যয় প্রায় সাত কোটি ২৬ লাখ টাকা বেশি।

প্রকল্প দুটির প্রস্তাবিত অঙ্গভিত্তিক ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, পায়রা ৬০ মেগাওয়াট প্রকল্পে সৌর প্যানেলের জন্য প্রায় ১৯৭ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। বিপরীতে মাতারবাড়ীর ৭০ মেগাওয়াট প্রকল্পে সৌর মডিউল ও ইনভার্টার মিলিয়ে ব্যয় প্রায় ১২০ কোটি টাকা। অর্থাৎ উৎপাদনক্ষমতা কম হলেও পায়রায় এই খাতে প্রায় ৭৭ কোটি টাকা বেশি বরাদ্দ রয়েছে। নির্মাণকালীন ঋণের সুদেও পার্থক্য দেখা যায়। মাতারবাড়ীতে সুদ বাবদ প্রায় ২০ কোটি টাকা ধরা হলেও পায়রায় তা প্রায় ৩৫ কোটি টাকা।

এ ছাড়া পায়রা প্রকল্পে বৈদ্যুতিক সরঞ্জামে প্রায় ১৮৮ কোটি টাকা এবং অন্যান্য যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামে প্রায় ২৭৯ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে। মাতারবাড়ীতে বিওপি সরঞ্জামে প্রায় ২৫৯ কোটি, অতিরিক্ত যন্ত্রাংশে ৪১ কোটি এবং বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থায় প্রায় ৮০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। পায়রায় ভূমি উন্নয়ন, সড়ক, নিষ্কাশন ও অন্যান্য স্থাপনায় প্রায় ৮৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।

বেশি ব্যয়ের বিষয়ে জানতে বিদ্যুৎসচিব মিরানা মাহরুখকে ফোন দিলে তাঁর মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা উইংয়ের অতিরিক্ত সচিব নূর মোহাম্মদ কাগজ না দেখে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

মাতারবাড়ী প্রকল্পের জন্য নির্বাচিত জমি মূলত বিদ্যুৎকেন্দ্রের ছাই রাখার কাজে ব্যবহারের জন্য নির্ধারিত ছিল। তবে সিপিজিসিবিএল জানিয়েছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদিত ছাই বিক্রি করা হচ্ছে। ফলে ওই জমি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এ প্রকল্পের সুবিধা হিসেবে বিদ্যমান সুরক্ষা বাঁধ, নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং কাছাকাছি বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব সুবিধা কাজে লাগানো গেলে নতুন অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন কমতে পারে।

পায়রা প্রকল্পের জমিটিও আগে থেকেই এক হাজার ৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। তাই নতুন করে জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে না।

প্রকল্প দুটির লক্ষ্য, বিদ্যমান জমি ও অবকাঠামো ব্যবহার করে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানো এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো।

মাতারবাড়ী প্রকল্পের প্রস্তাবে আপাতত ব্যাটারিতে বিদ্যুৎ সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। গত ২১ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত প্রকল্প যাচাই-বাছাই সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা যুক্ত করে নতুন প্রস্তাব তৈরি করতে গেলে বাস্তবায়নে অতিরিক্ত সময় লাগতে পারে।

সভায় জানানো হয়, সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এরই মধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে এবং ইআইবির পরামর্শকরা তা পর্যালোচনা করেছেন। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব এড়াতে আপাতত ব্যাটারি সংরক্ষণ ব্যবস্থা বাদ দিয়ে এগোনোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

মাতারবাড়ী কেন্দ্রের সৌর প্যানেলের সক্ষমতা হবে ৯০.৮১ মেগাওয়াট-পিক এবং বিকল্প প্রবাহে বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা হবে ৭০ মেগাওয়াট। কেন্দ্রটি থেকে বছরে গড়ে ১১ কোটি ৯২ লাখ ৯০ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের লক্ষ্য রয়েছে।

এর আগে গত ১৩ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় মাতারবাড়ীতে ৭০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের পাশাপাশি অন্তত ৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের সিদ্ধান্ত হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

পায়রা প্রকল্পটিকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে অননুমোদিত নতুন প্রকল্পের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগ সম্মতি দিয়েছে। অন্যদিকে মাতারবাড়ী প্রকল্পের প্রস্তাব মূল্যায়ন প্রক্রিয়া শুরুর সুপারিশসহ পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।

এ বিষয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম বলেন, মাতারবাড়ী ও পায়রা সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে ব্যয়ের যে অস্বাভাবিক তারতম্য দেখা যাচ্ছে, তা কোনোভাবেই ন্যায্য ও যৌক্তিক নয়। এ ধরনের প্রকল্পের মূলধনী ব্যয় (ক্যাপেক্স) ও পরিচালন ব্যয় (অপেক্স) নির্ধারণে সুনির্দিষ্ট মানদণ্ড থাকা জরুরি। সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও উপকরণের ব্যয় কাঠামো বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী তৈরি করা উচিত।

তাঁর অভিযোগ, বিগত সরকারের আমলে এ ধরনের মানদণ্ড যথাযথভাবে অনুসরণ না করায় ব্যয়ের অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়েছিল এবং কাঠামোগতভাবে লুণ্ঠনের পথ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এখনো সেই কাঠামো ভাঙা হয়নি। মাতারবাড়ী ও পায়রা প্রকল্পের ব্যয়ের পার্থক্য তারই প্রতিফলন।

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতেও বড় পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। আগামী এক বছরের মধ্যে ছাদভিত্তিক ব্যবস্থা থেকে চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ জন্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনে বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের যুক্ত করা হচ্ছে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় বিনিয়োগকারীরা নিজস্ব অর্থায়নে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করবেন।

সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশল ২০২৬-২০৩০ অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুতের ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে। বড় সৌর ব্যবস্থা স্থাপনের সুযোগ বাড়াতে নেট মিটারিং নির্দেশিকা সংশোধনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।