শেয়ারবাজারে বারবার বড় ধরনের ধস ও কারসাজির ঘটনা ঘটলেও দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ১৯৯৬ সালের শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি ও ২০১০ সালের ভয়াবহ ধসের পর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে সুনির্দিষ্ট অনিয়ম ও জড়িতদের নাম উঠে এলেও কারও বিচার হয়নি। কোনো অপরাধীর জেল হয়নি, বাতিল হয়নি কারও লাইসেন্সও। ফলে অপরাধীরা পার পেয়ে যাওয়ায় পুঁজিবাজারে বারবার অনিয়ম ও কারসাজির ঘটনা ঘটছে। বাংলাদেশ প্রতিদিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) সাবেক সভাপতি ও পুঁজিবাজার সংস্কার টাস্কফোর্সের সাবেক সদস্য বিশিষ্ট হিসাববিদ এ এফ নেছারউদ্দিন।
নেছারউদ্দিন বলেন, অনিয়মের মূল কারণ করপোরেট ও সরকারি পর্যায়ে সুশাসনের ভয়াবহ ঘাটতি। আদর্শ সুশাসন কাঠামোয় আইন ও বিধিবিধান মেনে ব্যবসা পরিচালনা, দক্ষ ও যোগ্য দল নিয়োগ এবং স্বতন্ত্র পরিচালক ও অডিট কমিটির মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথা। অথচ দেশের ব্যাংক খাত, নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত কোম্পানি, এমনকি সরকারি করপোরেশনেও ন্যূনতম সুশাসনের ঘাটতি রয়েছে। আইনের তোয়াক্কা না করে সিদ্ধান্ত নেওয়া, মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন ও নির্বাচনি ব্যবস্থার অস্পষ্টতা-সবই সামগ্রিক সুশাসনের দুর্বলতা তুলে ধরে। তবে তাঁর মতে, অনিয়মকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানই সাধারণত সঠিক হিসাব জমা দেয় বা প্রকাশ করে।
তিনি আরও বলেন, পুঁজিবাজারের পাশাপাশি রাজস্ব খাতেও সুশাসনের অভাবে শক্তিশালী দুর্নীতিচক্র গড়ে উঠেছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) কোম্পানিগুলোর জমা দেওয়া কর নথিতে প্রকৃত আয়-ব্যয়ের হিসাব যাচাইয়ে নজরদারির ঘাটতি রয়েছে। দেশের অধিকাংশ ব্যবসায়ী নিয়ম মেনে কর দিলেও একটি বড় অংশ রাজস্ব ফাঁকির সুযোগ নিচ্ছে।
নেছারউদ্দিনের ভাষ্য, রাজস্ব ফাঁকি ও অনিয়ম টিকিয়ে রাখতে অসৎ ব্যবসায়ী, কর বিভাগের অসাধু কর্মকর্তা ও কিছু অসাধু কনসালট্যান্টের সমন্বয়ে ত্রিমুখী চক্র গড়ে উঠেছে। কনসালট্যান্টরা জালিয়াতির কৌশল শেখান, অসাধু কর্মকর্তারা ঘুষের বিনিময়ে তা অনুমোদন করেন, আর ব্যবসায়ীরা কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেন। এই চক্র ভেঙে শেয়ারবাজার ও রাজস্ব খাতে আস্থা ফেরাতে কঠোর আইনি পদক্ষেপ ও সুশাসন নিশ্চিত করার বিকল্প নেই। বিশিষ্ট এই হিসাববিদ বলেন, রাজস্ব খাত ও পুঁজিবাজারে নানা ধরনের প্রতারণা ও জালিয়াতি চলছে। অস্তিত্বহীন চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট (সিএ) ফার্মের নামে ভুয়া অডিট রিপোর্ট তৈরি, ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশন কোড (ডিবিসি) ব্যবস্থা ফাঁকি দিয়ে নগদ লেনদেন গোপন এবং শেয়ারের দাম বাড়াতে শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) নিয়ে কারসাজি হচ্ছে। অথচ এসব ঠেকাতে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর তদারকি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। অনেক ক্ষেত্রে সিএ ফার্মের অস্তিত্ব না থাকলেও তাদের প্যাড ও স্বাক্ষর ব্যবহার করে অডিট রিপোর্ট তৈরি করা হচ্ছে। তিনি বলেন, এনবিআরের কর পরিদর্শকেরা নতুন করদাতা শনাক্ত করলেও ঘুষের বিনিময়ে তাঁদের করের আওতার বাইরে রাখছেন। ফলে করের আওতা বাড়ছে না। অন্যদিকে বড় ও বহুজাতিক কোম্পানিগুলো নিয়ম মেনে কর দেওয়ার পরও অন্যায্যভাবে অতিরিক্ত করের চাপে পড়ছে। অথচ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের কিছু প্রতিষ্ঠান ও অসাধু ব্যক্তি আপস-রফার মাধ্যমে বড় অঙ্কের কর ফাঁকি দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছেন।
২০১৯ সালে একাধিক হিসাব বিবরণী বন্ধে ডিবিসি ব্যবস্থা চালু হলেও রাজস্ব ফাঁকি বন্ধ হয়নি। অসাধু ব্যবসায়ীরা ডিবিসি নম্বর ঠিক রেখে নগদ বিক্রির একটি বড় অংশ হিসাবের বাইরে রাখছেন। ব্যাংকিং চ্যানেলের লেনদেন দেখিয়ে আর্থিক বিবরণীতে ব্রেক-ইভেন বা সামান্য লাভ দেখিয়ে নামমাত্র কর দেওয়া হচ্ছে। নগদ বিক্রির বড় অংশ থাকছে হিসাবের বাইরে। শুধু নসিহত করে মানুষকে সৎ করা সম্ভব নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, রাজস্ব ফাঁকি বন্ধে নগদ লেনদেন পুরোপুরি বন্ধ করে শতভাগ ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করা জরুরি।
শেয়ারবাজারে মূল্য সংবেদনশীল তথ্য (পিএসআই) ও ইপিএস নিয়ে কারসাজির অভিযোগ তুলে নেছারউদ্দিন বলেন, পরিচালনা পর্ষদ ও মালিকপক্ষের যোগসাজশে কোম্পানির ইপিএস কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে দেখানোর গুজব ছড়ানো হয়। শেয়ারের দাম কম থাকলে সংশ্লিষ্টরা নিজেরা শেয়ার কেনেন। পরে ইপিএস বাড়ার গুজব বা ভুয়া তথ্যে দাম বেড়ে গেলে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছে বেশি দামে শেয়ার বিক্রি করে তাঁরা সরে যান।
এ ধরনের কারসাজি ঠেকাতে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কঠোর নজরদারি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করেন তিনি। ভুল বা বিভ্রান্তিকর মূল্য সংবেদনশীল তথ্যের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা সর্বস্বান্ত না হন।
এ এফ নেছারউদ্দিন জ্যেষ্ঠ চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। নিরীক্ষা, কর, করপোরেট ফাইন্যান্স এবং ব্যবসায়িক পরামর্শ সেবায় তাঁর ৪০ বছরের বেশি সময়ের পেশাগত অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) সাবেক সভাপতি। বহুজাতিক কোম্পানি ও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষা, মূল্যায়ন, ডিউ ডিলিজেন্স এবং ব্যবসায়িক পরামর্শ সেবায় তিনি বিশেষজ্ঞ।
আদর্শ সুশাসন কাঠামোয় আইন ও বিধিবিধান মেনে ব্যবসা পরিচালনা, দক্ষ ও যোগ্য দল নিয়োগ এবং স্বতন্ত্র পরিচালক ও অডিট কমিটির মাধ্যমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথা। অথচ দেশের ব্যাংক খাত, নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত কোম্পানি, এমনকি সরকারি করপোরেশনেও ন্যূনতম সুশাসনের ঘাটতি রয়েছে


















