কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও রোবটের ব্যাপক উন্নতির ফলে ভবিষ্যতে মানুষের শ্রমের প্রয়োজনীয়তা কমে আসবে। একই সঙ্গে পণ্য ও সেবার উৎপাদন এতটাই বেড়ে যাবে যে একসময় অর্থের প্রচলিত গুরুত্বও হারিয়ে যেতে পারে। এমন ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ও টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক। তার মতে, অতি উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর প্রাচুর্যের যুগে সুদূর ভবিষ্যতের কথা ভেবে অর্থ সঞ্চয়ের কোনো অর্থ নেই।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেয়া এক পোস্টে মাস্ক লেখেন, ‘সুপার ইন্টেলিজেন্ট অ্যাবানড্যান্স’ বা অতি উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে সৃষ্ট প্রাচুর্যের যুগে ‘সুদূর ভবিষ্যতের জন্য অর্থ সঞ্চয় করা অর্থহীন।’
এক ব্যবহারকারীর পোস্টের জবাবে এ মন্তব্য করেন তিনি। ওই ব্যবহারকারী লিখেছিলেন, ভবিষ্যতে ব্যাপক প্রাচুর্য তৈরি হবে—এমন প্রত্যাশা থেকেই তিনি নিজের কিছু প্রশ্নবিদ্ধ আর্থিক সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি খুঁজে নিচ্ছেন। তবে তিনি অতিরিক্ত বেপরোয়া না হওয়ার পরামর্শও দেন। তার ভাষায়, কয়েক বছর পর এসব সিদ্ধান্তের বেশির ভাগেরই হয়তো আর কোনো গুরুত্ব থাকবে না।
ভবিষ্যতে অর্থের প্রয়োজনীয়তা কমে যাওয়ার বিষয়ে এবারই প্রথম কথা বলেননি ইলন মাস্ক। চলতি বছরের শুরুর দিকে উদ্যোক্তা ও এক্সপ্রাইজ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী চেয়ারম্যান পিটার ডায়ামান্ডিসের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারেও একই ধরনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছিলেন তিনি। ফোরচুনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই সাক্ষাৎকারে মাস্ক এমন এক পৃথিবীর ধারণা দেন, যেখানে মানুষের শ্রম ঐচ্ছিক হয়ে উঠবে এবং প্রচলিত মুদ্রাব্যবস্থার আর প্রয়োজন থাকবে না।
মাস্কের বিশ্বাস, এআই ও রোবট বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে। তার মতে, এআই ও রোবট এত বেশি পণ্য উৎপাদন এবং সেবা দিতে সক্ষম হবে যে মানুষের করার মতো কাজই খুব কম অবশিষ্ট থাকবে।
তিনি বলেন, রোবটনির্ভর উৎপাদনব্যবস্থায় পণ্য ও সেবার সরবরাহ অর্থের সরবরাহের তুলনায় অনেক বেশি বেড়ে যাবে। এর ফলে বাজারে পণ্য ও সেবার দাম ব্যাপকভাবে কমে প্রায় শূন্যের কাছাকাছি নেমে আসতে পারে।
মাস্কের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, রোবটের শ্রম হবে সাশ্রয়ী এবং নিরবচ্ছিন্ন। ফলে উৎপাদন ব্যয় কার্যত বিলীন হয়ে যাবে। পণ্য ও সেবা উৎপাদনের জন্য মানুষের শ্রমিকের প্রয়োজন না থাকলে তাঁদের মজুরি দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব হারাবে। এতে প্রচলিত অর্থব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা একসময় ফুরিয়ে যেতে পারে।
মাস্ক বলেন, ‘আমার মনে হয়, ভবিষ্যতের কোনো একপর্যায়ে অর্থের আর কোনো প্রাসঙ্গিকতা থাকবে না।’
সাক্ষাৎকারে পিটার ডায়ামান্ডিস মাস্কের বক্তব্যের সঙ্গে তার বিপুল সম্পদের বিষয়টি মিলিয়ে একটি প্রশ্ন করেন। তিনি বলেন, ‘আপনি যখন বহু ট্রিলিয়ন ডলারের মালিক হতে যাচ্ছেন, ঠিক তখনই কি অর্থের মূল্য কমতে শুরু করবে?’ জবাবে মাস্ক বলেন, ‘হ্যাঁ, অনেকটা সে রকমই।’
সর্বজনীন উচ্চ আয়ের প্রস্তাব মাস্কের
এআই ও রোবটের কারণে ভবিষ্যতে কর্মসংস্থানের সংকট তৈরি হতে পারে—এ বিষয়টিও তুলে ধরেছেন মাস্ক। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি ‘ইউনিভার্সাল হাই ইনকাম’ বা সর্বজনীন উচ্চ আয়ের ধারণার পক্ষে মত দিয়েছেন।
গত এপ্রিলে তিনি বলেন, এআই ও রোবটের কারণে ব্যাপক বেকারত্ব তৈরি হলে তা মোকাবিলার সবচেয়ে ভালো উপায় হতে পারে কেন্দ্রীয় সরকারের মাধ্যমে নাগরিকদের আর্থিক সহায়তা দেওয়া। তার প্রস্তাব অনুযায়ী, সরকারের পক্ষ থেকে সরাসরি অর্থ দেওয়ার মাধ্যমে মানুষ এআইনির্ভর উৎপাদনব্যবস্থায় সৃষ্ট প্রাচুর্যের সুবিধা পেতে পারে।
এক্সে দেওয়া এক পোস্টে মাস্ক লেখেন, ‘এআইয়ের কারণে সৃষ্ট বেকারত্ব মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া চেকের মাধ্যমে সর্বজনীন উচ্চ আয়ই সবচেয়ে ভালো উপায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘এআই ও রোবটিকসের মাধ্যমে পণ্য ও সেবার উৎপাদন অর্থের সরবরাহ বৃদ্ধির তুলনায় অনেক বেশি হবে। ফলে মূল্যস্ফীতি তৈরি হবে না।’
মাস্কের ধারণা, এআই ও রোবটনির্ভর অর্থনীতি উৎপাদনশীলতা এতটাই বাড়িয়ে দেবে যে মানুষের কাজ করার প্রয়োজনীয়তা এবং প্রচলিত অর্থব্যবস্থার ভূমিকা—দুটিই ভবিষ্যতে আমূল বদলে যেতে পারে।
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া


















