ঢাকা ০৭:১৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ১৯ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
অক্টোবরে ২ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা  জুলাই-অক্টোবরে রপ্তানি আয় ১৭ বিলিয়ন ডলার, প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ টানা সাত মাস ৫ শতাংশের নিচে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি পোশাক খাতে অস্থিরতা চলতে থাকলে ক্রয়াদেশ কমার আশঙ্কা রপ্তানিকারকদের প্রবাসীদের অ্যাকাউন্ট খোলায় এনআইডির বাধ্যবাধকতা শিথিল ও ঋণসীমা বাড়ানোর প্রস্তাব ব্যাংক এমডিদের চ্যালেঞ্জের মধ্যেও তৈরি পোশাকের ব্যবসা বাড়ছে, তবে মজুরি সবচেয়ে কম বাংলাদেশে মজুরি বোর্ড গঠনের তিন দিন পার হচ্ছে, সভা ডাকার কোনো উদ্যোগ নেই মুকেশ আম্বানি এখন এশিয়ার সেরা ধনী, সম্পদ কত বাড়ল ‘বাংলা কিউআর’ কোডে ব্যক্তিপর্যায়ে লেনদেন, যেভাবে পাবেন নিজের কোড এলপিজির নতুন দাম নির্ধারণ, ১২ কেজির সিলিন্ডার বেড়ে ২২৩ টাকা

ব্যাংক ‘লুট করে’ আটলান্টিকের ওপারে আবদুল হাই, বললেন ‘আমি বলির পাঁঠা

  • আপডেট সময় : ১০:৫৯:০০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬
  • ২ বার পড়া হয়েছে

‘আমি বলির পাঁঠা’—বলছিলেন বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই ওরফে বাচ্চু।

নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও আবদুল হাইয়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রমালিকানাধীন সবচেয়ে ভালো ব্যাংকটিকে সবচেয়ে খারাপ ব্যাংকে পরিণত করার অভিযোগ রয়েছে। আছে বিপুল অঙ্কের টাকা আত্মসাতের অভিযোগও।

অভিযোগগুলো নিয়ে আত্মগোপনে আবদুল হাই। খোঁজ নেই কয়েক বছর। অবশেষে তাঁর মুঠোফোন নম্বর পেলাম। গত জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে তাঁর সঙ্গে কয়েক দফা কথা হলো। কণ্ঠ পরিচিত। চিনতে অসুবিধা হলো না।

নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগের জবাব দিলেন আবদুল হাই। অভিযোগ অস্বীকার করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। পিছলে যাওয়ার সুযোগ কম। একপর্যায়ে বললেন, বেসিক ব্যাংক থেকে অনিয়ম করে ঋণ তিনি একা দেননি, তখনকার আওয়ামী লীগ সরকারের নেতারাও দায়ী। আরও বললেন, ‘আমাকে ফাঁসাইও না।’

আবদুল হাইয়ের গল্পের পুরোটা শোনার আগে তিন যুগের পাতা ওলটাতে হবে।\

১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ স্মল ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক পিএলসি, সংক্ষেপে বেসিক ব্যাংক। এই ব্যাংক ছিল ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের কাছে এক নির্ভরতার নাম। পদাধিকারবলে এ ব্যাংকের চেয়ারম্যান থাকতেন শিল্পসচিব। প্রতিষ্ঠার পর থেকে আবদুল হাই চেয়ারম্যান হওয়ার আগপর্যন্ত ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ কখনোই ৩-৪ শতাংশের বেশি হয়নি। ২০০৮ সাল পর্যন্ত সেটি সেরা ব্যাংকগুলোর একটি হিসেবে স্বীকৃত ছিল।

সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। দায়িত্ব নেয় ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে। ওই বছরের ১০ সেপ্টেম্বর শেখ আবদুল হাইকে বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান করা হয়।

আবদুল হাই ২০১৪ সালের জুলাই পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন। এই প্রায় পাঁচ বছরে ব্যাংকটিতে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়। রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে পরে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয় ব্যাংকটিকে। এ টাকা জনগণের করের টাকা। কিন্তু ব্যাংকটি যে মুখ থুবড়ে পড়ল, আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারল না।

কেন এবং কীভাবে দেশের ব্যাংক খাতের অন্যতম কেলেঙ্কারির এ ঘটনা ঘটল, তার পেছনে বহুমাত্রিক কাহিনি রয়েছে। বেসিক ব্যাংকের তৎকালীন কয়েকজন পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যে স্পষ্ট, আবদুল হাইকে নিয়োগ ও প্রশ্রয় দিতেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর আবদুল হাইয়ের দুর্নীতি নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়া ঠেকাতে চাপ দিতেন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) তৎকালীন কর্মকর্তারা।

তবে প্রথম আলো একের পর এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। আবদুল হাই বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অন্তত ৬৬টি মামলায় অভিযুক্ত। কিন্তু তিনি এখন কোথায়? দুদক বলছে, আবদুল হাই দেশেই আছেন। তবে আমরা খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি, আবদুল হাই আছেন কানাডায়, সপরিবার। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এর আগে ২০২৩ সালেই দেশ ছাড়েন তিনি। কোন মাসে ছেড়েছেন, তা তিনি বলেননি।

১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ স্মল ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক পিএলসি, সংক্ষেপে বেসিক ব্যাংক। এই ব্যাংক ছিল ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের কাছে এক নির্ভরতার নাম। পদাধিকারবলে এ ব্যাংকের চেয়ারম্যান থাকতেন শিল্পসচিব। প্রতিষ্ঠার পর থেকে আবদুল হাই চেয়ারম্যান হওয়ার আগপর্যন্ত ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ কখনোই ৩-৪ শতাংশের বেশি হয়নি। ২০০৮ সাল পর্যন্ত সেটি সেরা ব্যাংকগুলোর একটি হিসেবে স্বীকৃত ছিল।

সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। দায়িত্ব নেয় ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে। ওই বছরের ১০ সেপ্টেম্বর শেখ আবদুল হাইকে বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান করা হয়।

আবদুল হাই ২০১৪ সালের জুলাই পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন। এই প্রায় পাঁচ বছরে ব্যাংকটিতে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়। রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে পরে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয় ব্যাংকটিকে। এ টাকা জনগণের করের টাকা। কিন্তু ব্যাংকটি যে মুখ থুবড়ে পড়ল, আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারল না।

কেন এবং কীভাবে দেশের ব্যাংক খাতের অন্যতম কেলেঙ্কারির এ ঘটনা ঘটল, তার পেছনে বহুমাত্রিক কাহিনি রয়েছে। বেসিক ব্যাংকের তৎকালীন কয়েকজন পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যে স্পষ্ট, আবদুল হাইকে নিয়োগ ও প্রশ্রয় দিতেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর আবদুল হাইয়ের দুর্নীতি নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়া ঠেকাতে চাপ দিতেন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) তৎকালীন কর্মকর্তারা।

তবে প্রথম আলো একের পর এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। আবদুল হাই বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অন্তত ৬৬টি মামলায় অভিযুক্ত। কিন্তু তিনি এখন কোথায়? দুদক বলছে, আবদুল হাই দেশেই আছেন। তবে আমরা খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি, আবদুল হাই আছেন কানাডায়, সপরিবার। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এর আগে ২০২৩ সালেই দেশ ছাড়েন তিনি। কোন মাসে ছেড়েছেন, তা তিনি বলেননি।

কীভাবে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান

আটলান্টিক মহাসাগরের ওপার থেকে একাধিক দফায় মুঠোফোনে কয়েক ঘণ্টার আলাপে আবদুল হাই বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান হওয়ার পেছনের গল্প বললেন তাঁর মতো করে। তিনি ছিলেন জাতীয় পার্টির নেতা। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে বাগেরহাট-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানও হয়েছিলেন। ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর তিনি জাতীয় রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে যান।

রাষ্ট্রমালিকানাধীন বলে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে সাধারণত দায়িত্বে থাকতেন শিল্পসচিব। আওয়ামী লীগ সরকার আবদুল হাইকে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান বানায় প্রচলিত রীতির বড় ব্যতিক্রম ঘটিয়ে।

আবদুল হাই প্রথম আলোকে বলেন, ২০০৭-০৮ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ঢাকার বনানীতে তিনি একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন। পদাধিকারবলে সেখানকার ফ্ল্যাট মালিক সমিতির সভাপতি ছিলেন তখনকার সেনাপ্রধান মঈন ইউ আহমেদ। তিনি ছিলেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। তিনি (আবদুল হাই) বলেন, ‘সেই সময় সেনাপ্রধানের সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। বিভিন্ন বিষয়েই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ হতো। এই যোগাযোগকে তখন কাজে লাগিয়েছি। কী কাজে লাগিয়েছি, তা আর বলতে চাই না।’

সাবেক সেনাপ্রধান মঈন ইউ আহমেদ বহু বছর ধরে বিদেশে। আবদুল হাইয়ের দাবির বিষয়ে বক্তব্য পেতে তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়েছিল। পাঠানো হয়েছিল প্রশ্ন। তবে সাড়া পাওয়া যায়নি।

এদিকে আবদুল হাই বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক ছিল না, এখনো নেই। শেখ হাসিনা আমাকে দেখতে পারতেন না। কারণ, আমি ছিলাম জাতীয় পার্টির লোক।’

আবদুল হাইকে যখন বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান করা হয়, তখন অর্থমন্ত্রী ছিলেন আবুল মাল আবদুল মুহিত (প্রয়াত)। আবদুল হাইয়ের প্রতি তাঁর ক্ষোভ বিভিন্ন সময় প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু মুহিত ছিলেন অসহায়। তিনি বেসিক ব্যাংকে আবদুল হাইয়ের কর্মকাণ্ডকে ‘প্রায় ডাকাতের মতো’ বলেও মন্তব্য করেছিলেন। জাতীয় সংসদে তিনি বলেই ফেলেছিলেন, জালিয়াতদের ধরতে বাধা নিজের দলের লোক (২০১৬ সালের ৩০ জুন)।

আবুল মাল আবদুল মুহিতের মৃত্যু হয় ২০২২ সালের ৩০ এপ্রিল। সাবেক সেনাপ্রধান মঈন ইউ আহমেদ বিদেশে। ফলে কেন আবদুল হাইকে আওয়ামী লীগ বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান করেছিল, তা স্পষ্ট করা সম্ভব হয়নি। তবে এটা স্পষ্ট যে আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর আবদুল হাইয়ের প্রভাব ছিল। কারাগারে যাওয়ার বদলে আটলান্টিক পাড়ি দেওয়ার সুযোগ তাঁকে আওয়ামী লীগ সরকারই করে দিয়েছে।

বেসিক ব্যাংকের তৎকালীন একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ‘বেসিক ব্যাংকে যা হচ্ছিল, তা জানতে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত একদিন আমাকে ডেকেছিলেন। সব শোনার পর আমাকে তিনি বলেন, আবদুল হাই বাচ্চুকে সরিয়ে দেওয়া দরকার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনিও তা পারেননি।’

আবদুল হাইকে নিয়োগের পাশাপাশি ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে রাষ্ট্রমালিকানাধীন চার ব্যাংক, তথা সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে আওয়ামী লীগ সরকার। নিয়োগ দেওয়া হয় দলীয় বিবেচনায়। ২০১০ সালের ১১ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোর প্রথম পাতায় এ বিষয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘দলীয় নেতা ও সমর্থকদের পুরস্কৃত করে চার ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন’।

ভবন কেনার মাধ্যমে ‘দুর্নীতির শুরু’

আবদুল হাই চেয়ারম্যান হওয়ার তিন মাসের মাথায় ২০০৯ সালের ১৩ ডিসেম্বর বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভা হয়। ব্যাংকের নথিপত্র অনুযায়ী, ওই সভায় আবদুল হাই বেসিক ব্যাংকের নিজস্ব ভবন করার কথা বলেন। এর চার মাস পর ২০১০ সালের ১ এপ্রিল মতিঝিলে নির্মাণাধীন একটি ভবন কেনার জন্য ৮১ কোটি টাকার চুক্তি করে ব্যাংকটি।

কিন্তু চুক্তিটি ছিল অনিবন্ধিত। এ ধরনের চুক্তি আদালতে গ্রহণযোগ্য হয় না। চুক্তিতে বলা হয়, ভবনের নাম হবে ‘জামান-বেসিক ব্যাংক টাওয়ার’। জমির মালিক ছিলেন সিঙ্কু আকরামুজ্জামান। সিঙ্কু আকরামুজ্জামানের মালিকানাধীন একটি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের নাম বিজনেস রিসোর্সেস লিমিটেড। চুক্তিতে বলা হয়েছিল, ভবন নির্মাণের কাজ করবে বিজনেস রিসোর্সেস। অর্থাৎ জমি বিক্রি ও ভবন নির্মাণ—দুটিই একই ব্যক্তির কবলে।

২০১২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে বেরিয়ে আসে চুক্তির দিনই ব্যাংক থেকে ৪০ কোটি টাকা ছাড় করা হয়। ভবন নির্মাণের আগেই তড়িঘড়ি করে বেসিক ব্যাংকের তৎকালীন উপমহাব্যবস্থাপক নিরঞ্জন দেবনাথের মাধ্যমে (বর্তমানে আইসিবির এমডি) ৪০ কোটি টাকা পরিশোধের ব্যবস্থা করা হয়। এর কিছুদিনের মধ্যেই তিনি মহাব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি পান।

নিরঞ্জন দেবনাথ গত শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, ভবনের বিষয়ে পর্ষদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে একটি উপকমিটি করা হয়েছিল। উপকমিটি সুপারিশ করেছিল জরুরি ভিত্তিতে ৪০ কোটি টাকা পরিশোধ করার। তিনি বলেন, পরিস্থিতি তখন এতটাই খারাপ ছিল যে চেয়ারম্যানের গানপয়েন্টে এমডিসহ কারও পক্ষেই কথা বলার সুযোগ ছিল না।

ভবনের দাম হিসেবে পরে দুই বছরে আরও কয়েক দফায় পরিশোধ করা হয় ৩৬ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ৭৬ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়। কিন্তু জমির মালিকানা তখনো ছিল বিরোধপূর্ণ। এটি পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত ছিল। চলছিল মামলা। এখনো ভবনটির পূর্ণ দখল পায়নি ব্যাংক।

অনিবন্ধিত চুক্তি কেন করেছিলেন, এমন প্রশ্নের জবাবে আবদুল হাই এখন প্রথম আলোকে বলছেন, ‘এটা তখনকার আইনজীবী ভালো বলতে পারবেন। আমার পুরোপুরি মনে নেই।’

অবশ্য ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নথিপত্র ঘেঁটে বলছে, বিরোধপূর্ণ জমি, অনিবন্ধিত চুক্তি, এত টাকা দিয়ে দেওয়া, এসব ব্যাপারে শেখ আবদুল হাইয়ের ভূমিকাই ছিল প্রধান। তিনি নিজে এর মাধ্যমে লাভবান হয়েছিলেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্যাংক।

বেসিক ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান হেলাল আহমেদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা ভবনটিতে ওঠার অপেক্ষায় আছি। এতে ভাড়ার খরচটা বাঁচবে।’

ট্যাগস :

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

জনপ্রিয় সংবাদ

অক্টোবরে ২ দশমিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা 

ব্যাংক ‘লুট করে’ আটলান্টিকের ওপারে আবদুল হাই, বললেন ‘আমি বলির পাঁঠা

আপডেট সময় : ১০:৫৯:০০ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২ নভেম্বর ২০২৬

‘আমি বলির পাঁঠা’—বলছিলেন বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই ওরফে বাচ্চু।

নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও আবদুল হাইয়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রমালিকানাধীন সবচেয়ে ভালো ব্যাংকটিকে সবচেয়ে খারাপ ব্যাংকে পরিণত করার অভিযোগ রয়েছে। আছে বিপুল অঙ্কের টাকা আত্মসাতের অভিযোগও।

অভিযোগগুলো নিয়ে আত্মগোপনে আবদুল হাই। খোঁজ নেই কয়েক বছর। অবশেষে তাঁর মুঠোফোন নম্বর পেলাম। গত জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে তাঁর সঙ্গে কয়েক দফা কথা হলো। কণ্ঠ পরিচিত। চিনতে অসুবিধা হলো না।

নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগের জবাব দিলেন আবদুল হাই। অভিযোগ অস্বীকার করার চেষ্টা করলেন। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। পিছলে যাওয়ার সুযোগ কম। একপর্যায়ে বললেন, বেসিক ব্যাংক থেকে অনিয়ম করে ঋণ তিনি একা দেননি, তখনকার আওয়ামী লীগ সরকারের নেতারাও দায়ী। আরও বললেন, ‘আমাকে ফাঁসাইও না।’

আবদুল হাইয়ের গল্পের পুরোটা শোনার আগে তিন যুগের পাতা ওলটাতে হবে।\

১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ স্মল ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক পিএলসি, সংক্ষেপে বেসিক ব্যাংক। এই ব্যাংক ছিল ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের কাছে এক নির্ভরতার নাম। পদাধিকারবলে এ ব্যাংকের চেয়ারম্যান থাকতেন শিল্পসচিব। প্রতিষ্ঠার পর থেকে আবদুল হাই চেয়ারম্যান হওয়ার আগপর্যন্ত ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ কখনোই ৩-৪ শতাংশের বেশি হয়নি। ২০০৮ সাল পর্যন্ত সেটি সেরা ব্যাংকগুলোর একটি হিসেবে স্বীকৃত ছিল।

সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। দায়িত্ব নেয় ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে। ওই বছরের ১০ সেপ্টেম্বর শেখ আবদুল হাইকে বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান করা হয়।

আবদুল হাই ২০১৪ সালের জুলাই পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন। এই প্রায় পাঁচ বছরে ব্যাংকটিতে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়। রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে পরে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয় ব্যাংকটিকে। এ টাকা জনগণের করের টাকা। কিন্তু ব্যাংকটি যে মুখ থুবড়ে পড়ল, আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারল না।

কেন এবং কীভাবে দেশের ব্যাংক খাতের অন্যতম কেলেঙ্কারির এ ঘটনা ঘটল, তার পেছনে বহুমাত্রিক কাহিনি রয়েছে। বেসিক ব্যাংকের তৎকালীন কয়েকজন পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যে স্পষ্ট, আবদুল হাইকে নিয়োগ ও প্রশ্রয় দিতেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর আবদুল হাইয়ের দুর্নীতি নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়া ঠেকাতে চাপ দিতেন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) তৎকালীন কর্মকর্তারা।

তবে প্রথম আলো একের পর এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। আবদুল হাই বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অন্তত ৬৬টি মামলায় অভিযুক্ত। কিন্তু তিনি এখন কোথায়? দুদক বলছে, আবদুল হাই দেশেই আছেন। তবে আমরা খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি, আবদুল হাই আছেন কানাডায়, সপরিবার। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এর আগে ২০২৩ সালেই দেশ ছাড়েন তিনি। কোন মাসে ছেড়েছেন, তা তিনি বলেননি।

১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ স্মল ইন্ডাস্ট্রিজ অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক পিএলসি, সংক্ষেপে বেসিক ব্যাংক। এই ব্যাংক ছিল ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের কাছে এক নির্ভরতার নাম। পদাধিকারবলে এ ব্যাংকের চেয়ারম্যান থাকতেন শিল্পসচিব। প্রতিষ্ঠার পর থেকে আবদুল হাই চেয়ারম্যান হওয়ার আগপর্যন্ত ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ কখনোই ৩-৪ শতাংশের বেশি হয়নি। ২০০৮ সাল পর্যন্ত সেটি সেরা ব্যাংকগুলোর একটি হিসেবে স্বীকৃত ছিল।

সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। দায়িত্ব নেয় ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে। ওই বছরের ১০ সেপ্টেম্বর শেখ আবদুল হাইকে বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান করা হয়।

আবদুল হাই ২০১৪ সালের জুলাই পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন। এই প্রায় পাঁচ বছরে ব্যাংকটিতে সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়। রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে পরে সাড়ে ৩ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয় ব্যাংকটিকে। এ টাকা জনগণের করের টাকা। কিন্তু ব্যাংকটি যে মুখ থুবড়ে পড়ল, আর সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারল না।

কেন এবং কীভাবে দেশের ব্যাংক খাতের অন্যতম কেলেঙ্কারির এ ঘটনা ঘটল, তার পেছনে বহুমাত্রিক কাহিনি রয়েছে। বেসিক ব্যাংকের তৎকালীন কয়েকজন পরিচালক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যে স্পষ্ট, আবদুল হাইকে নিয়োগ ও প্রশ্রয় দিতেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর আবদুল হাইয়ের দুর্নীতি নিয়ে সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়া ঠেকাতে চাপ দিতেন প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) তৎকালীন কর্মকর্তারা।

তবে প্রথম আলো একের পর এক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। আবদুল হাই বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অন্তত ৬৬টি মামলায় অভিযুক্ত। কিন্তু তিনি এখন কোথায়? দুদক বলছে, আবদুল হাই দেশেই আছেন। তবে আমরা খোঁজ নিয়ে জানতে পেরেছি, আবদুল হাই আছেন কানাডায়, সপরিবার। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এর আগে ২০২৩ সালেই দেশ ছাড়েন তিনি। কোন মাসে ছেড়েছেন, তা তিনি বলেননি।

কীভাবে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান

আটলান্টিক মহাসাগরের ওপার থেকে একাধিক দফায় মুঠোফোনে কয়েক ঘণ্টার আলাপে আবদুল হাই বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান হওয়ার পেছনের গল্প বললেন তাঁর মতো করে। তিনি ছিলেন জাতীয় পার্টির নেতা। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে বাগেরহাট-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানও হয়েছিলেন। ১৯৯০ সালে এরশাদ সরকারের পতনের পর তিনি জাতীয় রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়ে যান।

রাষ্ট্রমালিকানাধীন বলে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে সাধারণত দায়িত্বে থাকতেন শিল্পসচিব। আওয়ামী লীগ সরকার আবদুল হাইকে বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান বানায় প্রচলিত রীতির বড় ব্যতিক্রম ঘটিয়ে।

আবদুল হাই প্রথম আলোকে বলেন, ২০০৭-০৮ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ঢাকার বনানীতে তিনি একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন। পদাধিকারবলে সেখানকার ফ্ল্যাট মালিক সমিতির সভাপতি ছিলেন তখনকার সেনাপ্রধান মঈন ইউ আহমেদ। তিনি ছিলেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। তিনি (আবদুল হাই) বলেন, ‘সেই সময় সেনাপ্রধানের সঙ্গে আমার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। বিভিন্ন বিষয়েই তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ হতো। এই যোগাযোগকে তখন কাজে লাগিয়েছি। কী কাজে লাগিয়েছি, তা আর বলতে চাই না।’

সাবেক সেনাপ্রধান মঈন ইউ আহমেদ বহু বছর ধরে বিদেশে। আবদুল হাইয়ের দাবির বিষয়ে বক্তব্য পেতে তাঁর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হয়েছিল। পাঠানো হয়েছিল প্রশ্ন। তবে সাড়া পাওয়া যায়নি।

এদিকে আবদুল হাই বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক ছিল না, এখনো নেই। শেখ হাসিনা আমাকে দেখতে পারতেন না। কারণ, আমি ছিলাম জাতীয় পার্টির লোক।’

আবদুল হাইকে যখন বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান করা হয়, তখন অর্থমন্ত্রী ছিলেন আবুল মাল আবদুল মুহিত (প্রয়াত)। আবদুল হাইয়ের প্রতি তাঁর ক্ষোভ বিভিন্ন সময় প্রকাশ পেয়েছে। কিন্তু মুহিত ছিলেন অসহায়। তিনি বেসিক ব্যাংকে আবদুল হাইয়ের কর্মকাণ্ডকে ‘প্রায় ডাকাতের মতো’ বলেও মন্তব্য করেছিলেন। জাতীয় সংসদে তিনি বলেই ফেলেছিলেন, জালিয়াতদের ধরতে বাধা নিজের দলের লোক (২০১৬ সালের ৩০ জুন)।

আবুল মাল আবদুল মুহিতের মৃত্যু হয় ২০২২ সালের ৩০ এপ্রিল। সাবেক সেনাপ্রধান মঈন ইউ আহমেদ বিদেশে। ফলে কেন আবদুল হাইকে আওয়ামী লীগ বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান করেছিল, তা স্পষ্ট করা সম্ভব হয়নি। তবে এটা স্পষ্ট যে আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর আবদুল হাইয়ের প্রভাব ছিল। কারাগারে যাওয়ার বদলে আটলান্টিক পাড়ি দেওয়ার সুযোগ তাঁকে আওয়ামী লীগ সরকারই করে দিয়েছে।

বেসিক ব্যাংকের তৎকালীন একজন পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ‘বেসিক ব্যাংকে যা হচ্ছিল, তা জানতে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত একদিন আমাকে ডেকেছিলেন। সব শোনার পর আমাকে তিনি বলেন, আবদুল হাই বাচ্চুকে সরিয়ে দেওয়া দরকার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনিও তা পারেননি।’

আবদুল হাইকে নিয়োগের পাশাপাশি ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে রাষ্ট্রমালিকানাধীন চার ব্যাংক, তথা সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করে আওয়ামী লীগ সরকার। নিয়োগ দেওয়া হয় দলীয় বিবেচনায়। ২০১০ সালের ১১ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোর প্রথম পাতায় এ বিষয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘দলীয় নেতা ও সমর্থকদের পুরস্কৃত করে চার ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন’।

ভবন কেনার মাধ্যমে ‘দুর্নীতির শুরু’

আবদুল হাই চেয়ারম্যান হওয়ার তিন মাসের মাথায় ২০০৯ সালের ১৩ ডিসেম্বর বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভা হয়। ব্যাংকের নথিপত্র অনুযায়ী, ওই সভায় আবদুল হাই বেসিক ব্যাংকের নিজস্ব ভবন করার কথা বলেন। এর চার মাস পর ২০১০ সালের ১ এপ্রিল মতিঝিলে নির্মাণাধীন একটি ভবন কেনার জন্য ৮১ কোটি টাকার চুক্তি করে ব্যাংকটি।

কিন্তু চুক্তিটি ছিল অনিবন্ধিত। এ ধরনের চুক্তি আদালতে গ্রহণযোগ্য হয় না। চুক্তিতে বলা হয়, ভবনের নাম হবে ‘জামান-বেসিক ব্যাংক টাওয়ার’। জমির মালিক ছিলেন সিঙ্কু আকরামুজ্জামান। সিঙ্কু আকরামুজ্জামানের মালিকানাধীন একটি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের নাম বিজনেস রিসোর্সেস লিমিটেড। চুক্তিতে বলা হয়েছিল, ভবন নির্মাণের কাজ করবে বিজনেস রিসোর্সেস। অর্থাৎ জমি বিক্রি ও ভবন নির্মাণ—দুটিই একই ব্যক্তির কবলে।

২০১২ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে বেরিয়ে আসে চুক্তির দিনই ব্যাংক থেকে ৪০ কোটি টাকা ছাড় করা হয়। ভবন নির্মাণের আগেই তড়িঘড়ি করে বেসিক ব্যাংকের তৎকালীন উপমহাব্যবস্থাপক নিরঞ্জন দেবনাথের মাধ্যমে (বর্তমানে আইসিবির এমডি) ৪০ কোটি টাকা পরিশোধের ব্যবস্থা করা হয়। এর কিছুদিনের মধ্যেই তিনি মহাব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি পান।

নিরঞ্জন দেবনাথ গত শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, ভবনের বিষয়ে পর্ষদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে একটি উপকমিটি করা হয়েছিল। উপকমিটি সুপারিশ করেছিল জরুরি ভিত্তিতে ৪০ কোটি টাকা পরিশোধ করার। তিনি বলেন, পরিস্থিতি তখন এতটাই খারাপ ছিল যে চেয়ারম্যানের গানপয়েন্টে এমডিসহ কারও পক্ষেই কথা বলার সুযোগ ছিল না।

ভবনের দাম হিসেবে পরে দুই বছরে আরও কয়েক দফায় পরিশোধ করা হয় ৩৬ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে ৭৬ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়। কিন্তু জমির মালিকানা তখনো ছিল বিরোধপূর্ণ। এটি পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত ছিল। চলছিল মামলা। এখনো ভবনটির পূর্ণ দখল পায়নি ব্যাংক।

অনিবন্ধিত চুক্তি কেন করেছিলেন, এমন প্রশ্নের জবাবে আবদুল হাই এখন প্রথম আলোকে বলছেন, ‘এটা তখনকার আইনজীবী ভালো বলতে পারবেন। আমার পুরোপুরি মনে নেই।’

অবশ্য ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নথিপত্র ঘেঁটে বলছে, বিরোধপূর্ণ জমি, অনিবন্ধিত চুক্তি, এত টাকা দিয়ে দেওয়া, এসব ব্যাপারে শেখ আবদুল হাইয়ের ভূমিকাই ছিল প্রধান। তিনি নিজে এর মাধ্যমে লাভবান হয়েছিলেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্যাংক।

বেসিক ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান হেলাল আহমেদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা ভবনটিতে ওঠার অপেক্ষায় আছি। এতে ভাড়ার খরচটা বাঁচবে।’