বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ বাইন্যান্সে রেকর্ড ৬৩০ কোটি ডলারের হ্যাকিংয়ের ঘটনায় নিজেদের নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারে দ্রুত পদক্ষেপ নিচ্ছে অন্যান্য ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ। একই সঙ্গে শিল্পজুড়ে সাইবার হামলার তথ্য দ্রুত বিনিময়ের আহ্বান জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো। মূলধারার আর্থিক ব্যবস্থায় ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহার বাড়তে থাকায় এ হামলা পুরো খাতের নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে এনেছে। খবর রয়টার্স।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো আর্থিক ব্যবস্থায় ডিজিটাল সম্পদের আরও গভীর অন্তর্ভুক্তির উদ্যোগ নিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বড় ধরনের সাইবার হামলার ঝুঁকি মোকাবিলায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিশ্লেষক ও খাতসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রতিষ্ঠান ফ্র্যাঙ্কলিন টেম্পলটনের ক্রিপ্টো বিভাগের প্রধান ক্রিস পারকিনস বলেন, ক্রিপ্টোকারেন্সির পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবিলম্বে উন্নতি করতে হবে।
এদিকে বাইন্যান্সে বৃহস্পতিবারের (২৯ অক্টোবর) হামলার পর অর্থ উত্তোলন বন্ধ করে দেওয়া হয়। বিশ্লেষকদের ধারণা, এ হামলার পেছনে উত্তর কোরিয়ার হ্যাকাররা জড়িত। তবে গ্রাহকদের ক্ষতি পূরণে নিজেদের তহবিল ব্যবহার করার ঘোষণা দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
বাইন্যান্সের কো-সিইও রিচার্ড টেং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানান, জটিল এ হামলার শুরু হতে পারে প্রতিষ্ঠানের এক সফটওয়্যার প্রকৌশলীর ল্যাপটপ হ্যাক হওয়ার মাধ্যমে। এর ফলে হ্যাকাররা অর্থ উত্তোলনের প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত সিস্টেমে প্রবেশের সুযোগ পায়। পরে তদন্তে আরও কয়েকটি নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা পাওয়া যায়। হামলার চিহ্ন মুছে ফেলার জন্য তৈরি সফটওয়্যার ব্যবহার করায় তদন্তও বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
বাইন্যান্সে হামলার পর শুক্রবারই প্রতিদ্বন্দ্বী ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জগুলো নিজেদের নিরাপত্তাব্যবস্থা শক্তিশালী করতে উদ্যোগ নেয়। পাশাপাশি গ্রাহকদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করে যে তাঁদের ক্রিপ্টো সম্পদ নিরাপদ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ কয়েনবেস জানিয়েছে, সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তারা অফলাইনে ক্রিপ্টোকারেন্সির চাবি সংরক্ষণের সিস্টেমে কিছু পরিবর্তন এনেছে। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, কেবল বাড়তি সতর্কতার অংশ হিসেবেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, ক্রাকেন জানিয়েছে, তাদের পূর্ণকালীন নিরাপত্তা দল প্রতিদিন সম্ভাব্য দুর্বলতা খুঁজে দেখে। শিল্পের বিভিন্ন সাইবার হামলার ঘটনাও পর্যবেক্ষণ করছে প্রতিষ্ঠানটি, যাতে সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের নিরাপত্তাব্যবস্থার উন্নতি করা যায়। তবে ইতিহাসে বড় ধরনের সাইবার হামলার নজির থাকা ক্রিপ্টো খাতের জন্য এ ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, আর্থিক ব্যবস্থায় ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তার গুরুত্বও বাড়ছে।
বড় আর্থিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা কম
বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির ঘটনা হলেও এর কারণে পুরো আর্থিক খাতে বড় ধরনের বিপর্যয় হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের ধারণা, ক্ষতি সামাল দেওয়ার মতো পর্যাপ্ত আর্থিক সক্ষমতা বাইন্যান্সের রয়েছে। বৃহস্পতিবার বিটকয়েনের দাম ৪ শতাংশের বেশি কমে যায়। দ্বিতীয় বৃহত্তম ক্রিপ্টোকারেন্সি ইথারের দামও ৫ শতাংশের বেশি পড়ে। তবে শুক্রবার উভয় মুদ্রার দাম কিছুটা ঘুরে দাঁড়ায়।
ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠান জিএসআরের প্রধান আইন ও কৌশল কর্মকর্তা জশ রিজম্যান বলেন, বাইন্যান্সকে সরাসরি এ হামলার ক্ষতি সামলাতে হলেও সামগ্রিকভাবে পুরো ক্রিপ্টো শিল্প বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে না বলে তাদের ধারণা।
উত্তর কোরিয়ার হ্যাকারদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ
যুক্তরাষ্ট্রের ব্লকচেইন বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবস ও চেইনঅ্যানালাইসিসের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে প্রায় ২০ মিনিটের মধ্যে হ্যাকিংয়ের বড় অংশ সম্পন্ন হয়। হামলার ধরন উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে আগে ওঠা সাইবার হামলার অভিযোগের সঙ্গে মিলে যায়। তবে ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ উত্তর কোরিয়া নিয়মিত অস্বীকার করে। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে জেনেভায় দেশটির মিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা কোনো জবাব দেয়নি।
সামাজিক কৌশলে তথ্য চুরি, অর্থ পাচারের নতুন ধরন
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এ হামলায় সামাজিক প্রকৌশল বা সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং কৌশল ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। এ পদ্ধতিতে হ্যাকাররা প্রতারণার মাধ্যমে ব্যক্তির কাছ থেকে গোপন তথ্য সংগ্রহ করে অথবা কোনো সিস্টেমে প্রবেশের অনুমতি আদায় করে নেয়। বাইন্যান্সের ওই প্রকৌশলীর ল্যাপটপ হ্যাক করার ক্ষেত্রেও এমন কৌশল ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে।
ক্রিপ্টো ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান সার্কিটের প্রধান নির্বাহী হ্যারি ডনেলি বলেন, এ ধরনের হামলা ঠেকাতে কর্মীদের আরও প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।
হামলার পর হ্যাকাররা দ্রুত চুরি করা অর্থ পাচারের চেষ্টা করে। কারণ, এক্সচেঞ্জ কর্তৃপক্ষ হামলার বিষয়টি শনাক্ত করার আগেই অর্থ সরিয়ে ফেলতে পারলে তা উদ্ধার করা কঠিন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট টোকেনের ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান সম্পদ আটকে দিতে পারলে অর্থ পাচার ঠেকানো সম্ভব।
স্টেবলকয়েন ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান টেথার জানিয়েছে, বাইন্যান্সের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ১৫৭ কোটি ডলারের সম্পদ তারা আটকে দিয়েছে। আরেক প্রতিষ্ঠান সার্কেল আটকে দিয়েছে ৮০ কোটি ডলারের সম্পদ। তবে বিটকয়েন ও ইথার আটকে দেওয়া সম্ভব নয়। কারণ, এসব ক্রিপ্টোকারেন্সির ওপর কোনো একক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নেই। চেইনঅ্যানালাইসিস জানিয়েছে, হ্যাকাররা অর্থ পাচারের এমন কিছু অত্যাধুনিক কৌশল ব্যবহার করছে, যা আগে তাদের নজরে আসেনি।
সমন্বিত সতর্কতা ব্যবস্থা চালুর আহ্বান
বাইন্যান্সে হামলার পর শুক্রবার কয়েকটি ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জের নির্বাহীরা পুরো শিল্পের জন্য সমন্বিত সাইবার হামলা শনাক্তকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ ওকেএক্সের প্রধান নির্বাহী স্টার শু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, এমন একটি তাৎক্ষণিক সতর্কতা ব্যবস্থা প্রয়োজন, যার মাধ্যমে কোনো প্রতিষ্ঠানে হামলা হলে সংশ্লিষ্ট সবাই দ্রুত তথ্য বিনিময় করতে পারবেন। পাশাপাশি সমন্বিতভাবে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া এবং সন্দেহজনক চুরি হওয়া অর্থ সাময়িকভাবে আটকে রাখাও সম্ভব হবে।
জিএসআরের কর্মকর্তা জশ রিজম্যান বলেন, বাইন্যান্সে হামলার ঘটনা পুরো ক্রিপ্টো শিল্পকে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে উৎসাহিত করতে পারে। প্রচলিত আর্থিক ব্যবস্থা ও ডিজিটাল সম্পদের মধ্যে সংযোগ বাড়ার এই সময়ে নিরাপত্তাব্যবস্থার উন্নতি অব্যাহত রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, সাম্প্রতিক হামলা এ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে।


















