বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার এবং জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। সফরের সবচেয়ে আলোচিত ঘোষণা হলো, আগামী পাঁচ বছরে জাপানি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশে সর্বোচ্চ এক ট্রিলিয়ন ইয়েন বা প্রায় ৬.৩ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে পারে।
এতে প্রায় দুই লাখ লোকের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে। তবে বিনিয়োগের পরিমাণ ও কর্মসংস্থান নির্ভর করবে কম্পানিগুলোর প্রকল্প নির্বাচন ও বাস্তবায়নের ওপর। সফরে দুই দেশ কয়েকটি সহযোগিতা দলিলে স্বাক্ষর করেছে। এর মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়ন, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং পরিবেশ বিষয়ে সমঝোতা স্মারক।
জলবায়ু সহযোগিতা ও বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বল্প-নিঃসরণ উন্নয়ন কৌশল তৈরিতে সহযোগিতার বিষয়ে আগ্রহপত্রও স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ ছাড়া সামুদ্রিক নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়াতে জাপানের অনুদান সহায়তায় টহল জাহাজ দেওয়ার বিষয় রয়েছে। এসব দলিল বিনিয়োগ, কৃষি ও জলবায়ু সহযোগিতার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করতে পারে। তবে সমঝোতা স্বাক্ষর করাই যথেষ্ট নয়; প্রতিটি ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা, দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ও অগ্রগতি পর্যালোচনার ব্যবস্থা দরকার।
দুই প্রধানমন্ত্রী বঙ্গোপসাগরীয় শিল্প প্রবৃদ্ধি বলয় বা ‘বিগ-বি’ উদ্যোগকে ‘অভিন্ন সমৃদ্ধির জন্য বিগ-বি’ হিসেবে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছেন। এর লক্ষ্য—আঞ্চলিক সংযোগ বাড়ানো, দুর্যোগ ও ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি মোকাবেলার প্রস্তুতি জোরদার এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির মাধ্যমে অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করা। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে কেন্দ্র করে লজিস্টিকস, জ্বালানি ও শিল্পের কেন্দ্র গড়ে উঠলে বাংলাদেশের উৎপাদন ও আঞ্চলিক বাণিজ্যে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে বন্দর, সড়ক, রেল, বিদ্যুৎ ও শিল্পাঞ্চলের কাজ সমন্বিতভাবে এগোতে হবে। সংযোগ অবকাঠামো দুর্বল থাকলে বন্দরের সম্ভাবনাও পুরোপুরি কাজে লাগানো যাবে না।
জাপানি বিনিয়োগ উৎপাদন খাতে নতুন পুঁজি, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা আনতে পারে। শিল্পের পরিসর বাড়লে বাংলাদেশের তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং স্থানীয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বড় কম্পানির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ পাবে। কৃষি, মৎস্য, তথ্য-প্রযুক্তি, ওষুধ ও অন্যান্য উৎপাদন খাতে সহযোগিতা বাড়লে রপ্তানি পণ্যের বৈচিত্র্যেও সহায়তা হতে পারে।
বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি দ্রুত কার্যকর হলে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং নতুন বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়বে। স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ বেশ কিছু বাণিজ্য সুবিধা হারাবে। বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারি চুক্তি কার্যকর হলে জাপানের বাজারে রপ্তানির সুযোগ বাড়বে এবং পণ্যের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে সহায়তা মিলবে। তবে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জাপানি কম্পানির যোগসূত্র, দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
বিনিয়োগ বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশকে ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করতে হবে। নীতির ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছ ও দ্রুত অনুমোদন, চুক্তির নিশ্চয়তা, নির্ভরযোগ্য জ্বালানি, উন্নত বন্দর-পরিবহন এবং দক্ষ কর্মী—এসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি দরকার। জমি ও অবকাঠামো প্রস্তুত থাকলে বিনিয়োগকারীদের প্রকল্প শুরু করা সহজ হবে। একই সঙ্গে শ্রমিকের অধিকার ও পরিবেশগত মান বজায় রাখতে হবে। প্রকল্পের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা করে দেখতে হবে, ঘোষিত বিনিয়োগ কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে এবং তা উৎপাদন, রপ্তানি ও কর্মসংস্থানে কী অবদান রাখছে।
জাপানের প্রস্তাব বাংলাদেশের জন্য বড় সুযোগ। কিন্তু ফল স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসবে না। এই সফরের সাফল্য নির্ভর করবে ঘোষিত অঙ্কের কতটা বিনিয়োগ বাস্তবে বাংলাদেশে আসে, কত কর্মসংস্থান তৈরি হয় এবং উৎপাদন ও রপ্তানি কতটা বাড়ে তার ওপর।


















