বিগত দুই বছরে কারসাজি ও অনিয়মের অভিযোগে স্থগিত করা বেনিফিশিয়ারি ওনার (বিও) অ্যাকাউন্টগুলোর একটি অংশের ওপর থেকে শেয়ার লেনদেনের নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। পুঁজিবাজারে নিয়মিত শেয়ার লেনদেন স্বাভাবিক করা এবং বাজারের তারল্য প্রবাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যেই এই নীতিগত ছাড় দেওয়ার কথা জানিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
আজ মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) আয়োজিত এক সভায় কমিশন এই সিদ্ধান্ত অনুমোদন করেছে বলে টিবিএসকে নিশ্চিত করেছেন বিএসইসির মুখপাত্র মো. আবুল কালাম।
তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্ত কিছু ব্যক্তি বিনিয়োগকারীর আবেদনের ওপর ভিত্তি করে—বিএসইসি প্রাথমিকভাবে কিছু নির্দিষ্ট বিও অ্যাকাউন্ট আংশিকভাবে সচল করেছে। এখন থেকে এসব বিও অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে নিয়মিত শেয়ার কেনাবেচা করা যাবে এবং নতুন তহবিল জমা দেওয়া যাবে। তবে চলমান তদন্ত বা অভিযোগ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত—এসব বিও হিসাব থেকে নগদ উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে।
এ ছাড়া বিও অ্যাকাউন্টধারীরা তাঁদের সুবিধা অনুযায়ী মার্জিন সুবিধা সমন্বয় করতে পারবেন এবং এসব বিও অ্যাকাউন্টের বিপরীতে যেকোনো আইনি দাবি নিষ্পত্তির পথও উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর— বিএসইসি নিজস্ব উদ্যোগের পাশাপাশি বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং আদালতের নির্দেশে বিপুলসংখ্যক বিও অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করার নির্দেশনা দিয়েছিল।
পুঁজিবাজারের বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময়ে রাজনীতিবিদ, উচ্চ সম্পদমূল্যের অধিকারী কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তির প্রায় ৬১৭টি বিও অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হয়।
স্থগিত করা প্রায় বিও অ্যাকাউন্টগুলোর মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ হিসাব বিএসইসি নিজেই স্থগিত করেছিল। মূলত শেয়ার দর কৃত্রিমভাবে বাড়ানো বা শেয়ার কারসাজির সুনির্দিষ্ট অভিযোগে, এসব অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এদের মধ্যে অনেক হাই-প্রোফাইল বিনিয়োগকারীকে ইতোপূর্বে উল্লেখযোগ্য অংকের জরিমানাও করা হয়েছে।
অন্যদিকে, বাকি ৫০ শতাংশ বিও অ্যাকাউন্ট স্থগিত করা হয়েছিল আদালতের আদেশ এবং বিএফআইইউ’য়ের নির্দেশনার ওপর ভিত্তি করে।
বিও ও ব্যাংক হিসাব সচলের আর্জি হিরুর
পুঁজিবাজারের আলোচিত ও সমালোচিত বিনিয়োগকারী আবুল খায়ের হিরু তাঁর নিজের, পরিবার এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে থাকা বিও ও ব্যাংক হিসাবগুলোর ওপর থেকে স্থগিতাদেশ তোলার জন্য গত ২৭ অক্টোবর বিএসইসির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেছেন। টিবিএস উক্ত চিঠির অনুলিপি হাতে পেয়েছে।
চিঠি অনুযায়ী, বিএফআইইউ-এর নির্দেশে যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করা হয়েছিল, তাদের মধ্যে রয়েছেন—আবুল খায়ের হিরু, কাজী সাদিয়া হাসান, আবুল কালাম মাতবর, কনিকা আফরোজ, আলেয়া বেগম, মোহাম্মদ বাশার, সাজেদ মাতবর, কাজী ফরিদ হাসান, কাজী ফুয়াদ হাসান এবং তাঁদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান: মোনার্ক হোল্ডিং, মোনার্ক মার্ট, ইশাল কমিউনিকেশনস, মোনার্ক এক্সপ্রেস, মোনার্ক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টস, মোনার্ক লেদার ইন্ডাস্ট্রিজ, মোনার্ক ফুড, মোনার্ক ইলেকট্রনিক্স, মোনার্ক স্পেস এক্সপ্লোরেশন, লাভা ইলেকট্রোডস ইন্ডাস্ট্রিজ এবং দেশ আইডিয়াল ট্রাস্ট কো-অপারেটিভ।
আবেদনে হিরু উল্লেখ করেন যে, এই সমস্ত ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ থাকার কারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও কোম্পানিগুলো মারাত্মক আর্থিক সংকটে পড়েছে এবং তাদের নিয়মিত ব্যবসা পরিচালনাসহ নিয়মিত দায়দেনা পরিশোধ করতে পারছে না।
চিঠিতে তিনি আরও বলেন, “আমরা বিনীতভাবে জানাচ্ছি যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং কোম্পানিগুলো বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সমস্ত বিদ্যমান আইন, বিধিবিধান ও নির্দেশনাসমূহ মেনে চলতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।” এজন্য কমিশনের দেওয়া যেকোনো অতিরিক্ত শর্ত বা নিয়ম মানতেও তাঁরা প্রস্তুত বলে জানান তিনি।
তিনি আরও অনুরোধ জানান, “বিদ্যমান সার্বিক পরিস্থিতির আলোকে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করে, প্রচলিত আইন ও নিয়ম মেনে উক্ত ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ও বিও হিসাবগুলোর ওপর থাকা বিধিনিষেধ প্রত্যাহার করে—তা দ্রুত সচল করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।”



















