ঢাকা ১০:০৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
অবৈধ ২২ অনলাইন পেমেন্ট এগ্রিগেটর প্ল্যাটফর্ম নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সতর্কবার্তা সপ্তাহ শুরু হলো, কোন সূচক কোথায় আছে জেনে নিন পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার ভিত্তি হতে পারে মিউচুয়াল ফান্ড আগস্টে ঘুরে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাজ্যে পোশাক রপ্তানি আগামী ৪ দিনের মধ্যে আয়কর রিটার্ন দিলে পাওয়া যাবে করছাড়, পাবেন না কারা দেশের বাজারে আজ যত টাকায় বিক্রি হচ্ছে স্বর্ণ ও রুপা সাশ্রয়ী ও দুর্যোগসহনশীল আবাসনে এডিবির ১০০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ হাম উপসর্গে একদিনে ৯ জনের মৃত্যু সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক রেখে বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার: বাণিজ্যমন্ত্রী গ্যাস-বিদ্যুতের ঘাটতিতে চাপে পোশাক শিল্প

যে মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানীর কাছে আকাশের রহস্য পড়তে শিখেছিল পুরো ইউরোপ

  • আপডেট সময় : ০৯:৪২:৫৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬
  • ৪০ বার পড়া হয়েছে

প্রায় এক হাজার বছর আগে স্পেনের তোলেদো শহরে বসে সূর্য, চাঁদ ও গ্রহের গতিবিধি নিয়ে গবেষণা করতেন এক মুসলিম জ্যোতির্বিদ। তার বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ, তৈরি করা যন্ত্র ও গাণিতিক পদ্ধতি পরবর্তী সময়ে আরবি থেকে লাতিনসহ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপে। এমনকি কয়েক শতক পর কোপার্নিকাসও তার কাজ থেকে তথ্য ও পদ্ধতি ব্যবহার করেন। সেই বিস্মৃতপ্রায় জ্যোতির্বিদ আল-জারকালির অবদানই আবার সামনে এসেছে স্পেনে সর্বসাম্প্রতিক সূর্যগ্রহণের প্রেক্ষাপটে।

মূলত শত শত বছর আগে আকাশের গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি বুঝতে যে জ্ঞান ও প্রযুক্তি কাজে লাগানো হতো, তার বড় একটি অংশ গড়ে উঠেছিল মুসলিম বিশ্বের বিজ্ঞানীদের হাত ধরে। একাদশ শতকের আন্দালুসীয় মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানী আল-জারকালি ছিলেন তাদেরই একজন। আজকের ইউরোপ যখন আবারও বিরল সূর্যগ্রহণের সাক্ষী হচ্ছে, তখন নতুন করে সামনে আসছে সেই বিস্মৃত মুসলিম বিজ্ঞানীর অবদান।

সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড বলছে, ৬৩২ খ্রিস্টাব্দের ২৭ জানুয়ারি মদিনায় ছিল সূর্যগ্রহণ। সেদিন দিনের আলো ধীরে ধীরে কমে আসছিল। একপর্যায়ে সূর্যগ্রহণ উপলক্ষে বিশেষ নামাজ সালাতুল কুসুফ আদায় করতে দাঁড়ালেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। সেদিন তাঁর শিশুপুত্র ইবরাহিম ইন্তেকাল করেন। এ কারণে কেউ কেউ বলতে শুরু করেন, তাঁর মৃত্যুর শোকে সূর্য অন্ধকার হয়ে গেছে।

কিন্তু মহানবী (সা.) এই কুসংস্কার প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, কারও জন্ম বা মৃত্যুর কারণে সূর্য বা চন্দ্রগ্রহণ হয় না। আলো ফিরে না আসা পর্যন্ত মানুষকে নামাজ আদায় ও আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করার আহ্বান জানান তিনি।

হাদিসে বর্ণিত এই ঘটনা আকাশের এমন ঘটনাকে ইসলাম কীভাবে দেখতে বলে, তার অন্যতম স্পষ্ট প্রাথমিক উদাহরণ। অর্থাৎ, মহাজাগতিক ঘটনাকে বিস্ময় ও বিনয়ের সঙ্গে দেখতে হবে, কিন্তু কুসংস্কারে বিশ্বাস করা যাবে না।

প্রায় ১৪ শতক পর আবারও আকাশ অন্ধকার হয়েছে। গত ১২ আগস্ট আইবেরীয় উপদ্বীপ থেকে এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা গেছে। স্পেনের ওপর দিয়ে এই সূর্যগ্রহণের ছায়া যাওয়ার সময় আলোচনায় আসবে আরেকটি যুগ। আর তা হলো—একাদশ শতকের আন্দালুসীয় জ্যোতির্বিদ আল-জারকালি। স্পেনের তোলেদো শহর থেকে তিনি সূর্য ও গ্রহের গতিবিধি নিয়ে গবেষণা করেছিলেন।

তোলেদো পূর্ণগ্রাসের পথের ঠিক বাইরে অবস্থিত। তাই সেখানে চাঁদ সূর্যের প্রায় ৯৯ দশমিক ৩ শতাংশ ঢেকে দেয়। ফলে প্রাচীন শহরটি থেকে আকাশে সূর্যের কেবল আগুনের মতো সরু একটি অংশ দেখা গেছে।

একাদশ শতকে তোলেদো ছিল মুসলিম শাসিত আমিরাতের একটি অংশ। শক্তিশালী আন্দালুসীয় রাষ্ট্র ভেঙে যাওয়ার পর এই আমিরাতের জন্ম হয়েছিল। আল-জারকালির পর্যবেক্ষণ তোলেদো টেবিলস তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সারণি গ্রহগুলোর গতিবিধি পূর্বাভাস দিতে ব্যবহার করা হতো।

লাতিন ভাষায় অনুবাদের মাধ্যমে তার জ্যোতির্বিজ্ঞানের কাজ ভাষা ও ধর্মের সীমা পেরিয়ে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক শতক পর ষোড়শ শতকের জ্যোতির্বিদ কোপার্নিকাস তার ‘ডি রেভোলিউশিওনিবুস অর্বিয়াম কোয়েলেস্টিয়াম’ (De revolutionibus orbium coelestium) গ্রন্থে আল-জারকালির লাতিন নাম আরজাকেল উল্লেখ করেন।

তোলেদোয় কাজ করা জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের দল

রোমানরা শহরটিকে বলত তোলেতুম। পরে আরবিতে পুরোনো নামের পরিবর্তিত রূপ হিসেবে এটি হয় তুলাইতুলা। শেষ পর্যন্ত স্প্যানিশ নাম তোলেদোই প্রচলিত হয়। গ্রানাইটের খাড়া পাহাড়ের ওপর গড়ে ওঠা শহরটির তিন দিক ঘিরে রয়েছে তাগুস নদী। আল-জারকালির সময়ে এটি ছিল মুসলিম শাসিত স্বাধীন তাইফা রাষ্ট্রের কেন্দ্র।

বার্সেলোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যযুগীয় আরবি জ্যোতির্বিজ্ঞানের গবেষক এমিলিয়া কালভো লাবার্তা বলেন, ‘তোলেদোর এই দল দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ চালিয়েছিল’। তিনি বলেন, ‘শুধু আল-জারকালি নন, কয়েকজন জ্যোতির্বিদ একসঙ্গে কাজ করতেন। তারা যে গবেষণাপত্র ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের বই লিখেছিলেন, সেগুলো আমাদের হাতে রয়েছে। পরবর্তী লেখকদের কাছ থেকেও তথ্য পাওয়া যায়। তবে তারা ঠিক কীভাবে এসব পর্যবেক্ষণ করতেন, তা আমরা জানি না।’

সে সময়ের বৈজ্ঞানিক লেখায় আল-জারকালিকে অসাধারণ দক্ষ যন্ত্র নির্মাতা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানে তিনি অনেকটাই স্বশিক্ষিত ছিলেন। তোলেদোর বিচারক ও ইতিহাসবিদ সাইদ আল-আন্দালুসির সঙ্গে তিনি কাজ করতেন। ধাতুর কাজ, জ্যামিতি এবং আকাশের বিভিন্ন বস্তুর পরিমাপ—এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে কাজে লাগানোর দক্ষতার কারণে শেষ পর্যন্ত আল-জারকালিই এই দলের প্রধান ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন।

ফাতিহ সুলতান মেহমেত ওয়াকিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ইতিহাস বিভাগের প্রধান মুস্তাফা কাচার বলেন, ‘দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণই ছিল তার সাফল্যের ভিত্তি। বিভিন্ন সূত্রে বলা হয়েছে, তিনি ২৫ বছর ধরে সূর্য এবং ৩৭ বছর ধরে চাঁদ পর্যবেক্ষণ করেছিলেন।’

তিনি বলেন, ‘এই ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তিনি সূর্য ও চাঁদের বিভিন্ন পরিমাপক নির্ণয় করতে পেরেছিলেন এবং টলেমির কাছ থেকে পাওয়া পুরোনো হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন। তোলেদোতে করা এসব পর্যবেক্ষণ পরবর্তী সময়ে ইউরোপে জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিকাশের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।’

আকাশের রহস্যকে হাতের নাগালে আনা

আল-জারকালি শুধু আকাশের গতিবিধি লিখে রাখেননি; এগুলো হিসাব করার যন্ত্রগুলোকেও নতুনভাবে তৈরি করেছিলেন। প্রচলিত অ্যাস্ট্রোল্যাব ব্যবহার করতে বিভিন্ন অক্ষাংশের জন্য আলাদা প্লেট প্রয়োজন হতো।

আল-জারকালির তৈরি আল-সাফিহা আল-জারকালিয়্যা নামে পরিচিত একটি বিশেষ প্লেট নতুন ধরনের একটি পদ্ধতি ব্যবহার করত। এটি মধ্যযুগীয় ইউরোপে সাফিয়া বা আজাফিয়া নামে পরিচিত ছিল। ফলে একই যন্ত্র দিয়ে বিভিন্ন অক্ষাংশে জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাব করা সম্ভব হতো।

কাচার বলেন, ‘একটি প্লেটের মধ্যেই এই বিষয়টি উপস্থাপনের জন্য তিনি গাণিতিক সমাধান বের করেছিলেন। বাস্তবে এর অর্থ হলো, পৃথিবীর প্রায় সব বসতিপূর্ণ অক্ষাংশেই যন্ত্রটি ব্যবহার করা যেত।’

প্রথম সংস্করণটি এতটাই জটিল ছিল যে এতে অসংখ্য পরস্পর ছেদ করা রেখা ও গ্রিড ছিল। তাই আল-জারকালি এটি কীভাবে ব্যবহার করতে হবে, তা বোঝাতে ১০০ অধ্যায়ের একটি নির্দেশিকা লেখেন। পরে তিনি শাক্কাজিয়্যা নামে আরও সহজ একটি সংস্করণ তৈরি করেন। এর সঙ্গে ছিল ৬০ অধ্যায়ের একটি ব্যাখ্যাগ্রন্থ।

তিনি এমন একটি ইকুয়েটোরিয়ামও তৈরি করেন, যা গ্রহের গতিবিধির বিভিন্ন মডেলকে ব্যবহারযোগ্য একটি যন্ত্রে রূপ দেয়। কালভো বলেন, ‘সারণি থেকে কোনও গ্রহের অবস্থান বের করা ছিল দীর্ঘ ও জটিল একটি প্রক্রিয়া। ইকুয়েটোরিয়ামের মাধ্যমে এই হিসাবের অনেকটাই আর করতে হতো না।’

তার তৈরি যন্ত্রে গ্রহের বিভিন্ন কক্ষপথ ও বৃত্তাকার গতিপথের মডেলগুলো প্লেটের ওপর বসানো ছিল। ফলে প্রতিবার শুরু থেকে হিসাব না করেই সেগুলো ব্যবহার করা যেত।

সূর্য ও গ্রহ সম্পর্কে নিজের তত্ত্বেও আল-জারকালি একই ধরনের নির্ভুলতা নিয়ে কাজ করেন। কয়েক দশকের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে তিনি বলেন, স্থির নক্ষত্রগুলোর তুলনায় সূর্যের সবচেয়ে দূরের অবস্থান ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়। তিনি এমন একটি মডেলও তৈরি করেন, যা কোপার্নিকাসের সময় পর্যন্ত জ্যোতির্বিদদের ওপর প্রভাব ফেলেছিল।

আল-জারকালির লেখা ইউরোপে পৌঁছায় জেরার্ড অব ক্রেমোনার অনুবাদের মাধ্যমে। ইতালীয় এই ব্যক্তি আরবি ভাষায় দক্ষ ছিলেন এবং সে সময় তোলেদোতে বসবাস করতেন। পরবর্তী সময়ে আল-জারকালির কাজ কাস্তিলীয়, লাতিন ও হিব্রু ভাষায় অনূদিত হয়। তার কাজ ইউরোপের একাধিক প্রজন্মের জ্যোতির্বিদকে প্রভাবিত করে।

কালভো বলেন, ‘পরবর্তী সময়ের লাতিন ভাষার বিভিন্ন গবেষণাগ্রন্থে তার সূর্যসংক্রান্ত মডেলের উদ্ভাবন অনুসরণ করতে দেখা যায়।’

তোলেদো থেকে কোপার্নিকাস সরাসরি একটি তৈরি সূর্যকেন্দ্রিক মহাবিশ্বের ধারণা পাননি। বরং তিনি পেয়েছিলেন পর্যবেক্ষণ, বিভিন্ন পরিমাপক এবং গাণিতিক পদ্ধতি, যেগুলোকে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি মহাবিশ্বের ধারণার সঙ্গে নতুনভাবে ব্যবহার করতে পেরেছিলেন।

‘ডি রেভোলিউশিওনিবুস’ (De revolutionibus) গ্রন্থের ১৫৪৩ সালের প্রথম সংস্করণে ‘আরজাকেল হিস্পানুস’ (Arzachel Hispanus) নামটি অন্য কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নামের পাশে উল্লেখ করা হয়, যাদের পরিমাপ কোপার্নিকাস বিশ্লেষণ করেছিলেন। আল-জারকালির সূর্যসংক্রান্ত মডেলকে সূর্যকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় রূপ দিয়ে কোপার্নিকাস তার যুগান্তকারী মহাবিশ্বের ধারণার একটি অংশ হিসেবে ব্যবহার করেন।

তবে অনুবাদের সঙ্গে সঙ্গে সময় ও ভাষার পরিবর্তনে মুসলিম নামগুলোরও রূপ বদলে যায়। আল-জারকালি স্প্যানিশ ভাষায় হয়ে যান আজারকিয়েল, আর লাতিনে আরজাকেল।

এসব নাম লাতিন ভাষাভাষীদের জন্য আরবি নাম উচ্চারণ সহজ করেছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এগুলো সেই ইসলামী জ্ঞানচর্চার জগতকে আড়ালও করে দেয়, যেখান থেকে এসব কাজের জন্ম হয়েছিল। ইউরোপ অনেক সময় হিসাব ও জ্ঞানটিকে ধরে রেখেছে, কিন্তু এর পেছনে থাকা ব্যক্তিটির পরিচয় ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে গেছে।

আরজাকেলকে ফিরে পাওয়া

কাচার বলেন, ‘তবে এই জ্ঞান পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। আল-জারকালির সার্বজনীন প্লেট নিয়ে লেখা গবেষণাগ্রন্থের আরবি পাণ্ডুলিপির কপি ইস্তাম্বুলে এখনও রয়েছে। এর মধ্যে সুলেমানিয়ে লাইব্রেরির আয়া সোফিয়া সংগ্রহ এবং নুরুসমানিয়ে সংগ্রহে থাকা পাণ্ডুলিপিও রয়েছে।’

কাস্তিলীয়, লাতিন ও হিব্রু ভাষার বিভিন্ন পাণ্ডুলিপি অন্য সংগ্রহশালায় ছড়িয়ে রয়েছে। এ ছাড়া দ্বাদশ শতকের একটি সাফিহা জারকালিয়্যা বার্সেলোনায় সংরক্ষিত আছে।

এসব নিদর্শন থেকে বোঝা যায়, এই জ্ঞান একবারে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পৌঁছায়নি। বরং কয়েক শতক ধরে পাণ্ডুলিপি নকল করা, অনুবাদ, মেরামত ও পুনর্ব্যবহারের মধ্য দিয়ে তা টিকে ছিল।

ইস্তাম্বুলের ইসলামি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ইতিহাস জাদুঘরে আল-জারকালির তৈরি যন্ত্রের একটি প্রতিরূপ রাখা হয়েছে। বিজ্ঞান ইতিহাসবিদ ফুয়াদ সেজগিন এই প্রতিরূপ তৈরির কাজ করেন। ২০০৮ সালে জাদুঘরটি চালু হওয়ার পর পাণ্ডুলিপি থেকে পাওয়া বর্ণনাগুলোকে বিভিন্ন প্রতিরূপ, মডেল ও যন্ত্রের মাধ্যমে তুলে ধরা হচ্ছে।

ফলে আল-জারকালির নকশা শুধু বইয়ের পাতায় সংরক্ষিত নেই; ইস্তাম্বুলে সেটিকে আবার ত্রিমাত্রিক রূপেও দেখা যায়। কাচার বলেন, লাতিন অনুবাদকরা সব লেখা অনুবাদ করেননি। তারা মূলত গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসা, রসায়ন ও দর্শনের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

আধুনিক ইতিহাসচর্চায় জ্ঞান হারিয়ে যাওয়ার আরেকটি কারণও তিনি তুলে ধরেন। কাচার বলেন, ‘উনিশ শতকে শুরু হওয়া প্রাচ্যবাদী চিন্তার কারণে আমরা এসব কাজ ভুলে গিয়েছিলাম। অন্যদিকে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির মতো ব্যক্তিদের মনে রাখা ও গ্রহণ করতে শিখেছি।’

তিনি বিজ্ঞান ইতিহাসবিদ ফুয়াদ সেজগিনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বৃহত্তর একটি ধারণার কথা উল্লেখ করেন। সেই ধারণা অনুযায়ী, ইউরোপীয় বিজ্ঞান একেবারে বিচ্ছিন্নভাবে বিকশিত হয়নি; বরং ইসলামী সভ্যতায় সঞ্চিত জ্ঞানও এর বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

আল-জারকালির ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পষ্ট। তোলেদোতে করা পর্যবেক্ষণ, ইউরোপজুড়ে নকল করা সারণি, কাস্তিলীয়, লাতিন ও হিব্রু ভাষায় তৈরি যন্ত্রের বর্ণনা এবং কয়েক শতক পরও কোপার্নিকাসের পর্যালোচনা করা বিভিন্ন পরিমাপক—সব মিলিয়ে জ্ঞান ছড়িয়ে পড়ার একটি সুস্পষ্ট ধারাবাহিকতা দেখা যায়।

কালভো নবম শতকে বাগদাদ ও মক্কাকে ঘিরে করা বিভিন্ন পরীক্ষার কথা উল্লেখ করেন। একাদশ শতকে আল-বিরুনিও একই ধরনের কাজ করেছিলেন বলে জানান তিনি। কালভো বলেন, ‘প্রাচীনকাল থেকেই জ্যোতির্বিদরা সূর্যগ্রহণের সময় আগে থেকে অনুমান করতে জানতেন। বিভিন্ন স্থানে সূর্যগ্রহণের সময় নথিবদ্ধ করে স্থানীয় সময়ের পার্থক্য কাজে লাগিয়ে তারা দ্রাঘিমা নির্ণয় করতে পারতেন।’

গত ১২ আগস্ট বিকেলে তোলেদো যখন প্রায় অন্ধকারে ডুবে যায়, তখন সূর্যের সরু আলোর রেখাটি যেন এমন এক জ্ঞানের প্রতীক হয়ে ওঠে, যা যুদ্ধ, মানুষের স্থানান্তর ও ভাষা হারানোর পরও টিকে আছে।

ট্যাগস :

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

জনপ্রিয় সংবাদ

অবৈধ ২২ অনলাইন পেমেন্ট এগ্রিগেটর প্ল্যাটফর্ম নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সতর্কবার্তা

যে মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানীর কাছে আকাশের রহস্য পড়তে শিখেছিল পুরো ইউরোপ

আপডেট সময় : ০৯:৪২:৫৮ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৬ অগাস্ট ২০২৬

প্রায় এক হাজার বছর আগে স্পেনের তোলেদো শহরে বসে সূর্য, চাঁদ ও গ্রহের গতিবিধি নিয়ে গবেষণা করতেন এক মুসলিম জ্যোতির্বিদ। তার বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ, তৈরি করা যন্ত্র ও গাণিতিক পদ্ধতি পরবর্তী সময়ে আরবি থেকে লাতিনসহ বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে ইউরোপে। এমনকি কয়েক শতক পর কোপার্নিকাসও তার কাজ থেকে তথ্য ও পদ্ধতি ব্যবহার করেন। সেই বিস্মৃতপ্রায় জ্যোতির্বিদ আল-জারকালির অবদানই আবার সামনে এসেছে স্পেনে সর্বসাম্প্রতিক সূর্যগ্রহণের প্রেক্ষাপটে।

মূলত শত শত বছর আগে আকাশের গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি বুঝতে যে জ্ঞান ও প্রযুক্তি কাজে লাগানো হতো, তার বড় একটি অংশ গড়ে উঠেছিল মুসলিম বিশ্বের বিজ্ঞানীদের হাত ধরে। একাদশ শতকের আন্দালুসীয় মুসলিম জ্যোতির্বিজ্ঞানী আল-জারকালি ছিলেন তাদেরই একজন। আজকের ইউরোপ যখন আবারও বিরল সূর্যগ্রহণের সাক্ষী হচ্ছে, তখন নতুন করে সামনে আসছে সেই বিস্মৃত মুসলিম বিজ্ঞানীর অবদান।

সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড বলছে, ৬৩২ খ্রিস্টাব্দের ২৭ জানুয়ারি মদিনায় ছিল সূর্যগ্রহণ। সেদিন দিনের আলো ধীরে ধীরে কমে আসছিল। একপর্যায়ে সূর্যগ্রহণ উপলক্ষে বিশেষ নামাজ সালাতুল কুসুফ আদায় করতে দাঁড়ালেন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)। সেদিন তাঁর শিশুপুত্র ইবরাহিম ইন্তেকাল করেন। এ কারণে কেউ কেউ বলতে শুরু করেন, তাঁর মৃত্যুর শোকে সূর্য অন্ধকার হয়ে গেছে।

কিন্তু মহানবী (সা.) এই কুসংস্কার প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, কারও জন্ম বা মৃত্যুর কারণে সূর্য বা চন্দ্রগ্রহণ হয় না। আলো ফিরে না আসা পর্যন্ত মানুষকে নামাজ আদায় ও আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করার আহ্বান জানান তিনি।

হাদিসে বর্ণিত এই ঘটনা আকাশের এমন ঘটনাকে ইসলাম কীভাবে দেখতে বলে, তার অন্যতম স্পষ্ট প্রাথমিক উদাহরণ। অর্থাৎ, মহাজাগতিক ঘটনাকে বিস্ময় ও বিনয়ের সঙ্গে দেখতে হবে, কিন্তু কুসংস্কারে বিশ্বাস করা যাবে না।

প্রায় ১৪ শতক পর আবারও আকাশ অন্ধকার হয়েছে। গত ১২ আগস্ট আইবেরীয় উপদ্বীপ থেকে এক শতাব্দীরও বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো পূর্ণ সূর্যগ্রহণ দেখা গেছে। স্পেনের ওপর দিয়ে এই সূর্যগ্রহণের ছায়া যাওয়ার সময় আলোচনায় আসবে আরেকটি যুগ। আর তা হলো—একাদশ শতকের আন্দালুসীয় জ্যোতির্বিদ আল-জারকালি। স্পেনের তোলেদো শহর থেকে তিনি সূর্য ও গ্রহের গতিবিধি নিয়ে গবেষণা করেছিলেন।

তোলেদো পূর্ণগ্রাসের পথের ঠিক বাইরে অবস্থিত। তাই সেখানে চাঁদ সূর্যের প্রায় ৯৯ দশমিক ৩ শতাংশ ঢেকে দেয়। ফলে প্রাচীন শহরটি থেকে আকাশে সূর্যের কেবল আগুনের মতো সরু একটি অংশ দেখা গেছে।

একাদশ শতকে তোলেদো ছিল মুসলিম শাসিত আমিরাতের একটি অংশ। শক্তিশালী আন্দালুসীয় রাষ্ট্র ভেঙে যাওয়ার পর এই আমিরাতের জন্ম হয়েছিল। আল-জারকালির পর্যবেক্ষণ তোলেদো টেবিলস তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সারণি গ্রহগুলোর গতিবিধি পূর্বাভাস দিতে ব্যবহার করা হতো।

লাতিন ভাষায় অনুবাদের মাধ্যমে তার জ্যোতির্বিজ্ঞানের কাজ ভাষা ও ধর্মের সীমা পেরিয়ে ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক শতক পর ষোড়শ শতকের জ্যোতির্বিদ কোপার্নিকাস তার ‘ডি রেভোলিউশিওনিবুস অর্বিয়াম কোয়েলেস্টিয়াম’ (De revolutionibus orbium coelestium) গ্রন্থে আল-জারকালির লাতিন নাম আরজাকেল উল্লেখ করেন।

তোলেদোয় কাজ করা জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের দল

রোমানরা শহরটিকে বলত তোলেতুম। পরে আরবিতে পুরোনো নামের পরিবর্তিত রূপ হিসেবে এটি হয় তুলাইতুলা। শেষ পর্যন্ত স্প্যানিশ নাম তোলেদোই প্রচলিত হয়। গ্রানাইটের খাড়া পাহাড়ের ওপর গড়ে ওঠা শহরটির তিন দিক ঘিরে রয়েছে তাগুস নদী। আল-জারকালির সময়ে এটি ছিল মুসলিম শাসিত স্বাধীন তাইফা রাষ্ট্রের কেন্দ্র।

বার্সেলোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যযুগীয় আরবি জ্যোতির্বিজ্ঞানের গবেষক এমিলিয়া কালভো লাবার্তা বলেন, ‘তোলেদোর এই দল দীর্ঘ সময় ধরে পর্যবেক্ষণ চালিয়েছিল’। তিনি বলেন, ‘শুধু আল-জারকালি নন, কয়েকজন জ্যোতির্বিদ একসঙ্গে কাজ করতেন। তারা যে গবেষণাপত্র ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের বই লিখেছিলেন, সেগুলো আমাদের হাতে রয়েছে। পরবর্তী লেখকদের কাছ থেকেও তথ্য পাওয়া যায়। তবে তারা ঠিক কীভাবে এসব পর্যবেক্ষণ করতেন, তা আমরা জানি না।’

সে সময়ের বৈজ্ঞানিক লেখায় আল-জারকালিকে অসাধারণ দক্ষ যন্ত্র নির্মাতা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। জ্যোতির্বিজ্ঞানে তিনি অনেকটাই স্বশিক্ষিত ছিলেন। তোলেদোর বিচারক ও ইতিহাসবিদ সাইদ আল-আন্দালুসির সঙ্গে তিনি কাজ করতেন। ধাতুর কাজ, জ্যামিতি এবং আকাশের বিভিন্ন বস্তুর পরিমাপ—এই তিনটি বিষয়কে একসঙ্গে কাজে লাগানোর দক্ষতার কারণে শেষ পর্যন্ত আল-জারকালিই এই দলের প্রধান ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন।

ফাতিহ সুলতান মেহমেত ওয়াকিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ইতিহাস বিভাগের প্রধান মুস্তাফা কাচার বলেন, ‘দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণই ছিল তার সাফল্যের ভিত্তি। বিভিন্ন সূত্রে বলা হয়েছে, তিনি ২৫ বছর ধরে সূর্য এবং ৩৭ বছর ধরে চাঁদ পর্যবেক্ষণ করেছিলেন।’

তিনি বলেন, ‘এই ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তিনি সূর্য ও চাঁদের বিভিন্ন পরিমাপক নির্ণয় করতে পেরেছিলেন এবং টলেমির কাছ থেকে পাওয়া পুরোনো হিসাব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছিলেন। তোলেদোতে করা এসব পর্যবেক্ষণ পরবর্তী সময়ে ইউরোপে জ্যোতির্বিজ্ঞানের বিকাশের অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে।’

আকাশের রহস্যকে হাতের নাগালে আনা

আল-জারকালি শুধু আকাশের গতিবিধি লিখে রাখেননি; এগুলো হিসাব করার যন্ত্রগুলোকেও নতুনভাবে তৈরি করেছিলেন। প্রচলিত অ্যাস্ট্রোল্যাব ব্যবহার করতে বিভিন্ন অক্ষাংশের জন্য আলাদা প্লেট প্রয়োজন হতো।

আল-জারকালির তৈরি আল-সাফিহা আল-জারকালিয়্যা নামে পরিচিত একটি বিশেষ প্লেট নতুন ধরনের একটি পদ্ধতি ব্যবহার করত। এটি মধ্যযুগীয় ইউরোপে সাফিয়া বা আজাফিয়া নামে পরিচিত ছিল। ফলে একই যন্ত্র দিয়ে বিভিন্ন অক্ষাংশে জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাব করা সম্ভব হতো।

কাচার বলেন, ‘একটি প্লেটের মধ্যেই এই বিষয়টি উপস্থাপনের জন্য তিনি গাণিতিক সমাধান বের করেছিলেন। বাস্তবে এর অর্থ হলো, পৃথিবীর প্রায় সব বসতিপূর্ণ অক্ষাংশেই যন্ত্রটি ব্যবহার করা যেত।’

প্রথম সংস্করণটি এতটাই জটিল ছিল যে এতে অসংখ্য পরস্পর ছেদ করা রেখা ও গ্রিড ছিল। তাই আল-জারকালি এটি কীভাবে ব্যবহার করতে হবে, তা বোঝাতে ১০০ অধ্যায়ের একটি নির্দেশিকা লেখেন। পরে তিনি শাক্কাজিয়্যা নামে আরও সহজ একটি সংস্করণ তৈরি করেন। এর সঙ্গে ছিল ৬০ অধ্যায়ের একটি ব্যাখ্যাগ্রন্থ।

তিনি এমন একটি ইকুয়েটোরিয়ামও তৈরি করেন, যা গ্রহের গতিবিধির বিভিন্ন মডেলকে ব্যবহারযোগ্য একটি যন্ত্রে রূপ দেয়। কালভো বলেন, ‘সারণি থেকে কোনও গ্রহের অবস্থান বের করা ছিল দীর্ঘ ও জটিল একটি প্রক্রিয়া। ইকুয়েটোরিয়ামের মাধ্যমে এই হিসাবের অনেকটাই আর করতে হতো না।’

তার তৈরি যন্ত্রে গ্রহের বিভিন্ন কক্ষপথ ও বৃত্তাকার গতিপথের মডেলগুলো প্লেটের ওপর বসানো ছিল। ফলে প্রতিবার শুরু থেকে হিসাব না করেই সেগুলো ব্যবহার করা যেত।

সূর্য ও গ্রহ সম্পর্কে নিজের তত্ত্বেও আল-জারকালি একই ধরনের নির্ভুলতা নিয়ে কাজ করেন। কয়েক দশকের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে তিনি বলেন, স্থির নক্ষত্রগুলোর তুলনায় সূর্যের সবচেয়ে দূরের অবস্থান ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়। তিনি এমন একটি মডেলও তৈরি করেন, যা কোপার্নিকাসের সময় পর্যন্ত জ্যোতির্বিদদের ওপর প্রভাব ফেলেছিল।

আল-জারকালির লেখা ইউরোপে পৌঁছায় জেরার্ড অব ক্রেমোনার অনুবাদের মাধ্যমে। ইতালীয় এই ব্যক্তি আরবি ভাষায় দক্ষ ছিলেন এবং সে সময় তোলেদোতে বসবাস করতেন। পরবর্তী সময়ে আল-জারকালির কাজ কাস্তিলীয়, লাতিন ও হিব্রু ভাষায় অনূদিত হয়। তার কাজ ইউরোপের একাধিক প্রজন্মের জ্যোতির্বিদকে প্রভাবিত করে।

কালভো বলেন, ‘পরবর্তী সময়ের লাতিন ভাষার বিভিন্ন গবেষণাগ্রন্থে তার সূর্যসংক্রান্ত মডেলের উদ্ভাবন অনুসরণ করতে দেখা যায়।’

তোলেদো থেকে কোপার্নিকাস সরাসরি একটি তৈরি সূর্যকেন্দ্রিক মহাবিশ্বের ধারণা পাননি। বরং তিনি পেয়েছিলেন পর্যবেক্ষণ, বিভিন্ন পরিমাপক এবং গাণিতিক পদ্ধতি, যেগুলোকে তিনি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি মহাবিশ্বের ধারণার সঙ্গে নতুনভাবে ব্যবহার করতে পেরেছিলেন।

‘ডি রেভোলিউশিওনিবুস’ (De revolutionibus) গ্রন্থের ১৫৪৩ সালের প্রথম সংস্করণে ‘আরজাকেল হিস্পানুস’ (Arzachel Hispanus) নামটি অন্য কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নামের পাশে উল্লেখ করা হয়, যাদের পরিমাপ কোপার্নিকাস বিশ্লেষণ করেছিলেন। আল-জারকালির সূর্যসংক্রান্ত মডেলকে সূর্যকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় রূপ দিয়ে কোপার্নিকাস তার যুগান্তকারী মহাবিশ্বের ধারণার একটি অংশ হিসেবে ব্যবহার করেন।

তবে অনুবাদের সঙ্গে সঙ্গে সময় ও ভাষার পরিবর্তনে মুসলিম নামগুলোরও রূপ বদলে যায়। আল-জারকালি স্প্যানিশ ভাষায় হয়ে যান আজারকিয়েল, আর লাতিনে আরজাকেল।

এসব নাম লাতিন ভাষাভাষীদের জন্য আরবি নাম উচ্চারণ সহজ করেছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে এগুলো সেই ইসলামী জ্ঞানচর্চার জগতকে আড়ালও করে দেয়, যেখান থেকে এসব কাজের জন্ম হয়েছিল। ইউরোপ অনেক সময় হিসাব ও জ্ঞানটিকে ধরে রেখেছে, কিন্তু এর পেছনে থাকা ব্যক্তিটির পরিচয় ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে গেছে।

আরজাকেলকে ফিরে পাওয়া

কাচার বলেন, ‘তবে এই জ্ঞান পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। আল-জারকালির সার্বজনীন প্লেট নিয়ে লেখা গবেষণাগ্রন্থের আরবি পাণ্ডুলিপির কপি ইস্তাম্বুলে এখনও রয়েছে। এর মধ্যে সুলেমানিয়ে লাইব্রেরির আয়া সোফিয়া সংগ্রহ এবং নুরুসমানিয়ে সংগ্রহে থাকা পাণ্ডুলিপিও রয়েছে।’

কাস্তিলীয়, লাতিন ও হিব্রু ভাষার বিভিন্ন পাণ্ডুলিপি অন্য সংগ্রহশালায় ছড়িয়ে রয়েছে। এ ছাড়া দ্বাদশ শতকের একটি সাফিহা জারকালিয়্যা বার্সেলোনায় সংরক্ষিত আছে।

এসব নিদর্শন থেকে বোঝা যায়, এই জ্ঞান একবারে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় পৌঁছায়নি। বরং কয়েক শতক ধরে পাণ্ডুলিপি নকল করা, অনুবাদ, মেরামত ও পুনর্ব্যবহারের মধ্য দিয়ে তা টিকে ছিল।

ইস্তাম্বুলের ইসলামি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ইতিহাস জাদুঘরে আল-জারকালির তৈরি যন্ত্রের একটি প্রতিরূপ রাখা হয়েছে। বিজ্ঞান ইতিহাসবিদ ফুয়াদ সেজগিন এই প্রতিরূপ তৈরির কাজ করেন। ২০০৮ সালে জাদুঘরটি চালু হওয়ার পর পাণ্ডুলিপি থেকে পাওয়া বর্ণনাগুলোকে বিভিন্ন প্রতিরূপ, মডেল ও যন্ত্রের মাধ্যমে তুলে ধরা হচ্ছে।

ফলে আল-জারকালির নকশা শুধু বইয়ের পাতায় সংরক্ষিত নেই; ইস্তাম্বুলে সেটিকে আবার ত্রিমাত্রিক রূপেও দেখা যায়। কাচার বলেন, লাতিন অনুবাদকরা সব লেখা অনুবাদ করেননি। তারা মূলত গণিত, জ্যোতির্বিজ্ঞান, চিকিৎসা, রসায়ন ও দর্শনের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন।

আধুনিক ইতিহাসচর্চায় জ্ঞান হারিয়ে যাওয়ার আরেকটি কারণও তিনি তুলে ধরেন। কাচার বলেন, ‘উনিশ শতকে শুরু হওয়া প্রাচ্যবাদী চিন্তার কারণে আমরা এসব কাজ ভুলে গিয়েছিলাম। অন্যদিকে লিওনার্দো দা ভিঞ্চির মতো ব্যক্তিদের মনে রাখা ও গ্রহণ করতে শিখেছি।’

তিনি বিজ্ঞান ইতিহাসবিদ ফুয়াদ সেজগিনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বৃহত্তর একটি ধারণার কথা উল্লেখ করেন। সেই ধারণা অনুযায়ী, ইউরোপীয় বিজ্ঞান একেবারে বিচ্ছিন্নভাবে বিকশিত হয়নি; বরং ইসলামী সভ্যতায় সঞ্চিত জ্ঞানও এর বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

আল-জারকালির ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও স্পষ্ট। তোলেদোতে করা পর্যবেক্ষণ, ইউরোপজুড়ে নকল করা সারণি, কাস্তিলীয়, লাতিন ও হিব্রু ভাষায় তৈরি যন্ত্রের বর্ণনা এবং কয়েক শতক পরও কোপার্নিকাসের পর্যালোচনা করা বিভিন্ন পরিমাপক—সব মিলিয়ে জ্ঞান ছড়িয়ে পড়ার একটি সুস্পষ্ট ধারাবাহিকতা দেখা যায়।

কালভো নবম শতকে বাগদাদ ও মক্কাকে ঘিরে করা বিভিন্ন পরীক্ষার কথা উল্লেখ করেন। একাদশ শতকে আল-বিরুনিও একই ধরনের কাজ করেছিলেন বলে জানান তিনি। কালভো বলেন, ‘প্রাচীনকাল থেকেই জ্যোতির্বিদরা সূর্যগ্রহণের সময় আগে থেকে অনুমান করতে জানতেন। বিভিন্ন স্থানে সূর্যগ্রহণের সময় নথিবদ্ধ করে স্থানীয় সময়ের পার্থক্য কাজে লাগিয়ে তারা দ্রাঘিমা নির্ণয় করতে পারতেন।’

গত ১২ আগস্ট বিকেলে তোলেদো যখন প্রায় অন্ধকারে ডুবে যায়, তখন সূর্যের সরু আলোর রেখাটি যেন এমন এক জ্ঞানের প্রতীক হয়ে ওঠে, যা যুদ্ধ, মানুষের স্থানান্তর ও ভাষা হারানোর পরও টিকে আছে।