কিছু কণ্ঠ শুধু গান গায় না, সময়কে ধরে রাখে। একটি প্রজন্ম পেরিয়ে আরেক প্রজন্মে পৌঁছে যায় সেই কণ্ঠের আবেশ। আশা ভোঁসলে ছিলেন তেমনই এক শিল্পী। ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে তার নাম উচ্চারণ করলেই সামনে আসে অসংখ্য গান, অসংখ্য সুর, আর তার চেয়েও বেশি বৈচিত্র্য। আট দশকের দীর্ঘ সংগীতজীবনে তিনি ১২ হাজারের বেশি গান রেকর্ড করেছেন বিভিন্ন ভাষায়। হিন্দি, মারাঠি, বাংলা থেকে গজল, কাওয়ালি, পপ, ক্যাবারে প্রায় সব ধরনের গানেই নিজের আলাদা জায়গা তৈরি করেছিলেন তিনি।
আশা ভোঁসলের জন্মদিন আজ। ১৯৩৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর জন্ম আশার। সংগীতের পরিবারেই বেড়ে ওঠা। বাবা দীননাথ মঙ্গেশকর ছিলেন শাস্ত্রীয় সংগীতের শিল্পী ও নাট্যব্যক্তিত্ব। ছোট বয়সেই বাবার কাছে সংগীতের তালিম শুরু। মাত্র ১০ বছর বয়সে গান গাওয়ার জগতে প্রবেশ করেন তিনি। ১৯৪৩ সালে মারাঠি ছবি ‘মাঝা বাল’-এ প্রথম চলচ্চিত্রের গান করেন। সেখান থেকে শুরু হওয়া পথটি ধীরে ধীরে তাকে ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম বহুমুখী কণ্ঠশিল্পীতে পরিণত করে।
শুরুর পথটা অবশ্য সহজ ছিল না। বড় বোন লতা মঙ্গেশকর তখন নিজেই সংগীতের আকাশে এক বিশাল নাম। একই পরিবারের দুই বোনের মধ্যে তুলনা ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু আশা নিজের পথ আলাদা করে নেন। একসময় তিনি নিজেই জানিয়েছিলেন, বোনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় না গিয়ে নিজের গায়কির ধরন আলাদা করার জন্য তিনি পশ্চিমা সংগীতের প্রভাবও গ্রহণ করেছিলেন।
আশার নিজস্ব জগৎ
আশার কণ্ঠে ছিল মিষ্টি আর কোমলতা। আবার প্রয়োজন হলে সেই কণ্ঠই হয়ে উঠেছে বিষণ্ণ, গভীর কিংবা শাস্ত্রীয়। আশার গানের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তিনি কোনো একটি ছাঁচে আটকে থাকেননি। ষাট-সত্তরের দশক থেকে শুরু করে নব্বইয়ের দশক এবং পরবর্তী সময়েও তিনি বারবার নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন। ‘রেঞ্জিলা রে’-এর মতো গান দিয়ে নব্বইয়ের প্রজন্মের কাছেও তিনি নিজের স্বতন্ত্রতা নতুন করে প্রমাণ করেছিলেন।
বাংলা গানে ভিন্নটা এনেছিলেন আশা
তবে বাঙালি শ্রোতার কাছে আশার পরিচয় শুধু হিন্দি গানের শিল্পী হিসেবে নয়। বাংলা গানেও তার কণ্ঠ তৈরি করেছে আলাদা এক আবহ। বাংলা আধুনিক গান, চলচ্চিত্রের গান কিংবা প্রেমের গান বাঙালি শ্রোতার কাছে তাঁর গাওয়া অনেক গান আজও পুরোনো হয় না।
‘চোখে চোখে কথা বলো’, ‘যেতে দাও আমায় দেখো না’, ‘কথা হয়েছিল’, ‘তারে ভোলানো গেল না’, ‘মৌহুয়ায় জমেছে আজ মৌ গো’, ‘আজ দোলে মন কার ইশারাতে’, ‘বউ কথা কও’—এমন বহু বাংলা গান আশার কণ্ঠে পেয়েছে আলাদা প্রাণ।
বাংলা গানে আশার বিশেষত্ব ছিল তার উচ্চারণের স্বাভাবিকতা এবং আবেগ প্রকাশের ভঙ্গি। তিনি বাংলা ভাষার শিল্পী না হয়েও বাংলা গানের কথার আবেগকে কণ্ঠে এমনভাবে ধারণ করেছিলেন যে অনেক সময় শ্রোতার মনে হয়নি, এটি অন্য ভাষার শিল্পীর গাওয়া গান।
বাংলা গানের সঙ্গে তার সম্পর্ক আরও গভীর হয়েছিল বাংলার সুরকার ও সংগীত পরিচালকদের সঙ্গে কাজের মধ্য দিয়ে। আর ডি বর্মণের সঙ্গে তার দীর্ঘ সংগীত-সহযোগিতার কথা আলাদা করে বলতেই হয়। হিন্দি সংগীতে এই জুটি যেমন অসংখ্য স্মরণীয় গান উপহার দিয়েছে, তেমনি বাংলাতেও তাদের কাজ শ্রোতাদের মনে জায়গা করে নিয়েছে।
আশার বাংলা গান শুনলে তাই মনে হয়, তিনি শুধু সুরের সঙ্গে গলা মেলাননি গানের চরিত্রটিকেও নিজের কণ্ঠে ধারণ করেছেন। কখনো প্রেমিকা, কখনো অভিমানী নারী, কখনো উচ্ছল তরুণী প্রতিটি অনুভূতির জন্য তার কণ্ঠ যেন আলাদা রং খুঁজে পেয়েছে।
কিংবদন্তি আশা
আশা ভোঁসলের দীর্ঘ ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি চোখে পড়ে, তা হলো তার থেমে না যাওয়ার মানসিকতা। বয়স বাড়লেও গান থেকে নিজেকে সরিয়ে নেননি। ৯০ বছর বয়সেও মঞ্চে দাঁড়িয়ে দীর্ঘ সময় গান গেয়েছেন। ২০২৩ সালে ৯০তম জন্মদিনে দুবাইয়ে বড় আয়োজনের কনসার্টেও তিনি গান পরিবেশন করেছিলেন।
২০১১ সালে গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসও তাকে বিশ্বের সর্বাধিক রেকর্ড করা শিল্পীদের অন্যতম হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তাঁর দীর্ঘ সংগীতজীবন শুধু সংখ্যার বিচারে বড় নয়; বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁর গান শুনেছে, নিজেদের জীবনের নানা মুহূর্তের সঙ্গে মিলিয়ে নিয়েছে।
২০২৬ সালের ১২ এপ্রিল ৯২ বছর বয়সে তার মৃত্যু হয়। তার চলে যাওয়ায় ভারতীয় সংগীতজগতে তৈরি হয়েছে এক বিশাল শূন্যতা। কিন্তু শিল্পীদের ক্ষেত্রে মৃত্যু অনেক সময় শেষ কথা নয়। তাদের কণ্ঠ থেকে যায় গান হয়ে, স্মৃতি হয়ে।

























