ঢাকা ১০:০৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
অবৈধ ২২ অনলাইন পেমেন্ট এগ্রিগেটর প্ল্যাটফর্ম নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সতর্কবার্তা সপ্তাহ শুরু হলো, কোন সূচক কোথায় আছে জেনে নিন পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার ভিত্তি হতে পারে মিউচুয়াল ফান্ড আগস্টে ঘুরে দাঁড়িয়েছে যুক্তরাজ্যে পোশাক রপ্তানি আগামী ৪ দিনের মধ্যে আয়কর রিটার্ন দিলে পাওয়া যাবে করছাড়, পাবেন না কারা দেশের বাজারে আজ যত টাকায় বিক্রি হচ্ছে স্বর্ণ ও রুপা সাশ্রয়ী ও দুর্যোগসহনশীল আবাসনে এডিবির ১০০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ হাম উপসর্গে একদিনে ৯ জনের মৃত্যু সরবরাহ চেইন স্বাভাবিক রেখে বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকার: বাণিজ্যমন্ত্রী গ্যাস-বিদ্যুতের ঘাটতিতে চাপে পোশাক শিল্প

গান, চলচ্চিত্র আর বিদ্রোহে কেন বারবার ফিরে আসেন নজরুল

  • আপডেট সময় : ১১:০১:৫৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ২০ বার পড়া হয়েছে

দ্রোহ, জাগরণ এবং সাম্যের প্রতীক হিসেবে বাংলা সাহিত্যে অনন্য উচ্চতায় অবস্থান করছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তার কবিতা, গান ও সাহিত্যকর্ম শুধু একটি সময়কে ধারণ করেনি বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাঙালির চিন্তা, চেতনা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে আছে। আজ কবির ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হচ্ছে তার বহুমাত্রিক সৃষ্টিকে।

কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টি আজও জীবন্ত। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক কিংবা গান যে মাধ্যমেই তিনি লিখেছেন, সেখানেই নিজের সময়কে ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো কিছু রেখে গেছেন। তাই নজরুল কেবল একটি সাহিত্যিক নাম নন; তিনি বাঙালির প্রতিবাদ, প্রেম ও মানবতার সাংস্কৃতিক প্রতীক।

বাংলা সাহিত্যে নজরুলের সবচেয়ে বড় অবদান তার বিদ্রোহী কণ্ঠ। ‘বিদ্রোহী’, ‘সাম্যবাদী’, ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কিংবা ‘প্রলয় শিখা’র মতো রচনায় তিনি অন্যায়, শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। একই সঙ্গে তার লেখায় আছে প্রেম, প্রকৃতি, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও মানবতার প্রকাশ।

গানে নজরুল 

নজরুলের জনপ্রিয়তার বড় একটি কারণ তার গান। তিনি বাংলা গানে গজলধারার শক্তিশালী সংযোজন করেন। প্রেমের গান থেকে দেশাত্মবোধক গান, ইসলামী সংগীত থেকে শ্যামাসংগীত বিষয়ের এমন বৈচিত্র্য বাংলা গানের ইতিহাসে তাকে আলাদা অবস্থান দিয়েছে। 

‘কারার ঐ লৌহ কপাট’, ‘চল চল চল’, ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে’, ‘ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ’, ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী’, ‘ভেঙেছে দুয়ার এসেছ জ্যোতির্ময়’, ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’, ‘প্রজাপতি প্রজাপতি’, ‘তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি’ নজরুলের অসংখ্য গান মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে। এর মধ্যে ‘চল চল চল’ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। গানটি এখন বাংলাদেশের রণসংগীত। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয়ভাবে এটি রণসংগীত হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

সিনেমায় নজরুলের অবদান 

নজরুল শুধু সিনেমার গান লিখেছেন এমনটা ভাবলে তার চলচ্চিত্র-অবদানের বড় অংশই বাদ পড়ে যায়। তিনি ছিলেন গীতিকার, সুরকার, সংগীত পরিচালক, কাহিনিকার, চিত্রনাট্যকার, অভিনেতা এবং চলচ্চিত্র পরিচালকও। ১৯৩৪ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ধ্রুব’ চলচ্চিত্রটি তিনি সত্যেন্দ্রনাথ দের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালনা করেন এবং নারদ চরিত্রে অভিনয়ও করেন। চলচ্চিত্র ইতিহাসবিদদের মতে, এটি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এ ছাড়া ‘সাপুড়ে’ সিনেমার কাহিনি ও সংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন নজরুল। ‘চৌরঙ্গী’ ও আরও কয়েকটি চলচ্চিত্রেও তার গান ও সুর ব্যবহৃত হয়েছে।

শুধু চলচ্চিত্রে কাজ করাই নয়, তার সাহিত্যও বারবার উঠে এসেছে বড় পর্দায়। নজরুলের ‘মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাস এবং ‘ব্যথার দান’, ‘পদ্মগোখরা’, ‘রাক্ষুসী’, সহ বিভিন্ন গল্প অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। 

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রেও তার গানের উপস্থিতি দীর্ঘদিনের। ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ চলচ্চিত্রে নজরুলের গান ব্যবহৃত হয়েছে। ‘জীবন থেকে নেয়া’য় ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’, ‘চন্দ্রকথা’য় ‘পথহারা পাখি’, ‘দারুচিনি দ্বীপ’ ও ‘মেহের নিগার’-এর মতো চলচ্চিত্রেও নজরুলের গান নতুন প্রেক্ষাপটে দর্শকের সামনে এসেছে।

আন্দোলনের মিছিলে ফিরে আসেন নজরুল

নজরুলকে আন্দোলনের কবি বলা হয়। তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আর তরুণদের জেগে ওঠার কথা বলেছেন। তাই যখন মানুষ অন্যায়, বৈষম্য বা দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে রাজপথে নামে, তখন নজরুলের কবিতা ও গান খুব সহজেই তাদের কণ্ঠে জায়গা করে নেয়।

‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ যেন বন্দিত্বের বিরুদ্ধে সরাসরি উচ্চারণ। আর ‘চল চল চল’ তরুণদের এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান। তার কবিতার ভাষা তাই শুধু বইয়ের পাতায় আটকে থাকে না, প্রয়োজনের মুহূর্তে তা স্লোগান, মিছিলের গান কিংবা প্রতিবাদের সাংস্কৃতিক অস্ত্র হয়ে ওঠে। নজরুলের লেখা কোনো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য লিখে থেমে থাকেননি। তার লেখা বারবার ফিরে আসে আন্দোলনের ভাষা হয়ে। 

মৃত্যুর পরেও কবির কণ্ঠ থামেনি। নতুন কোনো প্রজন্ম যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় তিনি ফিরে আসেন। গানের আর সিনেমায় নতুন রুপে ফিরে আসেন নজরুল ইসলাম। আর তার অবদান আজীবন টিকে থাকবে বাংলা সাহিত্যে বাংলার প্রতিবাদে। 

ট্যাগস :

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

জনপ্রিয় সংবাদ

অবৈধ ২২ অনলাইন পেমেন্ট এগ্রিগেটর প্ল্যাটফর্ম নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সতর্কবার্তা

গান, চলচ্চিত্র আর বিদ্রোহে কেন বারবার ফিরে আসেন নজরুল

আপডেট সময় : ১১:০১:৫৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দ্রোহ, জাগরণ এবং সাম্যের প্রতীক হিসেবে বাংলা সাহিত্যে অনন্য উচ্চতায় অবস্থান করছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তার কবিতা, গান ও সাহিত্যকর্ম শুধু একটি সময়কে ধারণ করেনি বরং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাঙালির চিন্তা, চেতনা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে আছে। আজ কবির ৫০তম মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হচ্ছে তার বহুমাত্রিক সৃষ্টিকে।

কাজী নজরুল ইসলামের সৃষ্টি আজও জীবন্ত। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক কিংবা গান যে মাধ্যমেই তিনি লিখেছেন, সেখানেই নিজের সময়কে ছাড়িয়ে যাওয়ার মতো কিছু রেখে গেছেন। তাই নজরুল কেবল একটি সাহিত্যিক নাম নন; তিনি বাঙালির প্রতিবাদ, প্রেম ও মানবতার সাংস্কৃতিক প্রতীক।

বাংলা সাহিত্যে নজরুলের সবচেয়ে বড় অবদান তার বিদ্রোহী কণ্ঠ। ‘বিদ্রোহী’, ‘সাম্যবাদী’, ‘কাণ্ডারী হুঁশিয়ার’ কিংবা ‘প্রলয় শিখা’র মতো রচনায় তিনি অন্যায়, শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন। একই সঙ্গে তার লেখায় আছে প্রেম, প্রকৃতি, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও মানবতার প্রকাশ।

গানে নজরুল 

নজরুলের জনপ্রিয়তার বড় একটি কারণ তার গান। তিনি বাংলা গানে গজলধারার শক্তিশালী সংযোজন করেন। প্রেমের গান থেকে দেশাত্মবোধক গান, ইসলামী সংগীত থেকে শ্যামাসংগীত বিষয়ের এমন বৈচিত্র্য বাংলা গানের ইতিহাসে তাকে আলাদা অবস্থান দিয়েছে। 

‘কারার ঐ লৌহ কপাট’, ‘চল চল চল’, ‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে’, ‘ত্রিভুবনের প্রিয় মুহাম্মদ’, ‘মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী’, ‘ভেঙেছে দুয়ার এসেছ জ্যোতির্ময়’, ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’, ‘প্রজাপতি প্রজাপতি’, ‘তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি’ নজরুলের অসংখ্য গান মানুষের মুখে মুখে ফিরেছে। এর মধ্যে ‘চল চল চল’ বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। গানটি এখন বাংলাদেশের রণসংগীত। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয়ভাবে এটি রণসংগীত হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

সিনেমায় নজরুলের অবদান 

নজরুল শুধু সিনেমার গান লিখেছেন এমনটা ভাবলে তার চলচ্চিত্র-অবদানের বড় অংশই বাদ পড়ে যায়। তিনি ছিলেন গীতিকার, সুরকার, সংগীত পরিচালক, কাহিনিকার, চিত্রনাট্যকার, অভিনেতা এবং চলচ্চিত্র পরিচালকও। ১৯৩৪ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ধ্রুব’ চলচ্চিত্রটি তিনি সত্যেন্দ্রনাথ দের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালনা করেন এবং নারদ চরিত্রে অভিনয়ও করেন। চলচ্চিত্র ইতিহাসবিদদের মতে, এটি বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ। এ ছাড়া ‘সাপুড়ে’ সিনেমার কাহিনি ও সংগীতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন নজরুল। ‘চৌরঙ্গী’ ও আরও কয়েকটি চলচ্চিত্রেও তার গান ও সুর ব্যবহৃত হয়েছে।

শুধু চলচ্চিত্রে কাজ করাই নয়, তার সাহিত্যও বারবার উঠে এসেছে বড় পর্দায়। নজরুলের ‘মৃত্যুক্ষুধা’ উপন্যাস এবং ‘ব্যথার দান’, ‘পদ্মগোখরা’, ‘রাক্ষুসী’, সহ বিভিন্ন গল্প অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। 

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রেও তার গানের উপস্থিতি দীর্ঘদিনের। ‘নবাব সিরাজউদ্দৌলা’ চলচ্চিত্রে নজরুলের গান ব্যবহৃত হয়েছে। ‘জীবন থেকে নেয়া’য় ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’, ‘চন্দ্রকথা’য় ‘পথহারা পাখি’, ‘দারুচিনি দ্বীপ’ ও ‘মেহের নিগার’-এর মতো চলচ্চিত্রেও নজরুলের গান নতুন প্রেক্ষাপটে দর্শকের সামনে এসেছে।

আন্দোলনের মিছিলে ফিরে আসেন নজরুল

নজরুলকে আন্দোলনের কবি বলা হয়। তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আর তরুণদের জেগে ওঠার কথা বলেছেন। তাই যখন মানুষ অন্যায়, বৈষম্য বা দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে রাজপথে নামে, তখন নজরুলের কবিতা ও গান খুব সহজেই তাদের কণ্ঠে জায়গা করে নেয়।

‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ যেন বন্দিত্বের বিরুদ্ধে সরাসরি উচ্চারণ। আর ‘চল চল চল’ তরুণদের এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান। তার কবিতার ভাষা তাই শুধু বইয়ের পাতায় আটকে থাকে না, প্রয়োজনের মুহূর্তে তা স্লোগান, মিছিলের গান কিংবা প্রতিবাদের সাংস্কৃতিক অস্ত্র হয়ে ওঠে। নজরুলের লেখা কোনো নির্দিষ্ট সময়ের জন্য লিখে থেমে থাকেননি। তার লেখা বারবার ফিরে আসে আন্দোলনের ভাষা হয়ে। 

মৃত্যুর পরেও কবির কণ্ঠ থামেনি। নতুন কোনো প্রজন্ম যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায় তিনি ফিরে আসেন। গানের আর সিনেমায় নতুন রুপে ফিরে আসেন নজরুল ইসলাম। আর তার অবদান আজীবন টিকে থাকবে বাংলা সাহিত্যে বাংলার প্রতিবাদে।