আর্থিক সংকটে থাকা দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী সিটি গ্রুপকে ব্যবসায় সক্রিয় করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তারই অংশ হিসেবে গ্রুপটির পাঁচটি খেলাপি প্রতিষ্ঠানকে ৩ হাজার কোটি টাকার চলতি মূলধন ঋণ দিতে ব্যাংক কোম্পানি আইনের একটি ধারা স্থগিত করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। গতকাল বুধবার বাংলাদেশ ব্যাংক এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে।
সিটি গ্রুপের যে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে এই সুবিধা দেওয়া হয়েছে সেগুলো হলো সিটি সিড ক্রাশিং ইন্ডাস্ট্রিজ, সিটি সুগার ইন্ডাস্ট্রিজ, সিটি এডিবল অয়েল, সিটি ডাল মিলস ও শম্পা ফ্লাওয়ার মিলস। এসব প্রতিষ্ঠানকে ৩ হাজার কোটি টাকার চলতি মূলধন সুবিধা দিতে সিটি ব্যাংকের নেতৃত্বে সিন্ডিকেটেড অর্থায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য ব্যাংক কোম্পানি আইনের ২৭কক(৩) ধারা আগামী বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত স্থগিত করা হয়। এই ধারা অনুযায়ী কোনো খেলাপি প্রতিষ্ঠানকে কোনো ধরনের ঋণসুবিধা দিতে পারে না কোনো ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। তবে এই ধারা আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত সিটি গ্রুপের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না।
ব্যাংকসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সিটি গ্রুপের পাঁচ প্রতিষ্ঠানকে চলতি মূলধনসুবিধা দিতে সিন্ডিকেটেড ঋণে সিটি ব্যাংকের নেতৃত্বে থাকছে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক, ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, ট্রাস্ট ব্যাংক,এনসিসি ও পূবালী ব্যাংক। এসব ব্যাংক মিলে ৩ হাজার কোটি টাকা জোগান দেবে সিটি গ্রুপের পাঁচ প্রতিষ্ঠানকে। তবে এই জোটে আরও ব্যাংক যুক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান প্রথম আলোকে বলেন, অর্থসংকটে পড়া সিটি গ্রুপের ভালো প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে ব্যবসা করতে পারে, এ জন্য এই সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এই সুবিধাকে উদাহরণ ধরে ঢালাওভাবে অন্য কাউকে একই সুবিধা দেওয়া হবে না। তবে কেউ সমস্যায় পড়লে বাংলাদেশ ব্যাংক সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে ব্যবস্থা নেবে। দেশের অর্থনীতির স্বার্থে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কাজ করছে।
গত ২৫ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংকে গভর্নর মোস্তাকুর রহমান সিটি গ্রুপকে সংকট থেকে বের করার বিষয়ে ঋণদাতা কয়েকটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেই বৈঠকে সিটি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. হাসানও উপস্থিত ছিলেন। ওই বৈঠকের পর গতকাল সিটি গ্রুপকে নতুন করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছে। গত ২৫ অক্টোবরের সভায় সিটি গ্রুপকে মূলধন জোগান দিতে ঋণদাতা ব্যাংকের সমন্বয়ে একটি জোট গঠনেরও উদ্যোগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে সিটি গ্রুপের কাছে ৪৩ ব্যাংকের বকেয়া ঋণের পরিমাণ ২৬ হাজার কোটি টাকার বেশি, যা এরই মধ্যে খেলাপি হয়ে গেছে।
ঋণ পেতে মানতে হবে শর্ত
আইন শিথিল করে সিটি গ্রুপকে যে সুবিধা দেওয়া হয়েছে, তার জন্য কিছু শর্তও জুড়ে দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এসব শর্তের মধ্যে বলা হয়েছে, প্রস্তাবিত ঋণসুবিধার বিপরীতে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো দায় সৃষ্টি হবে না। ভবিষ্যতে সিটি ব্যাংক বা সিন্ডিকেটভুক্ত অন্য কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকে কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা দাবি করতে পারবে না। প্রস্তাবিত ঋণসুবিধার বিপরীতে যুক্তিসংগত জামানত নিশ্চিত করতে সিটি গ্রুপ তাদের অন্য কোনো ঋণ বা দায়ে আবদ্ধ নয়—এমন সম্পত্তি রেজিস্টার্ড মর্টগেজ হিসেবে প্রদান করবে। সিন্ডিকেটেড ঋণের অর্থে কেনা পণ্য বিক্রি করে যে টাকা পাওয়া যাবে, তা একটি নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাবে জমা রাখতে হবে এবং সেখান থেকে আনুপাতিক হারে সিন্ডিকেটেড ঋণসুবিধা প্রদানকারী ব্যাংকগুলোর পাওনা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিয়মিত পরিশোধ করতে হবে।
মুনাফা থেকে হঠাৎ কেন সংকটে
সিটি গ্রুপের নিরীক্ষিত বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গ্রুপটির ২৪টি প্রতিষ্ঠান রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গ্রুপটি ৯৪৬ কোটি টাকা নিট বা প্রকৃত মুনাফা করে। ওই বছরে গ্রুপটি ৩২ হাজার ৮৭৬ কোটি টাকার পণ্য বিক্রি করেছিল। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মুনাফা করেছিল ১ হাজার ৬১ কোটি টাকা, ওই বছরে বিক্রি করে ৩২ হাজার ৫৪০ কোটি টাকার পণ্য। ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে গ্রুপটির কাছে গুদামজাত পণ্যসহ নগদযোগ্য সম্পদের পরিমাণ ছিল ৩৪ হাজার ৩৮৪ কোটি টাকা, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে যার পরিমাণ ছিল ৩৪ হাজার ২৫০ কোটি টাকা। তবে চলতি বছর তা কমে যায়। তবে সিটি গ্রুপ যে সংকটে পড়ছে, তা দুই বছর আগেও টের পায়নি ঋণদাতা ব্যাংকগুলো।
এদিকে মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় হোসেন্দি অর্থনৈতিক অঞ্চলে ১২ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে লবণ, সিমেন্ট, চিনি, তরলীকৃত জ্বালানি গ্যাস (এলপিজি) ও কাগজ উৎপাদন ও জাহাজ তৈরির কারখানা গড়ে তুলে গ্রুপটি। তবে গ্যাস না পাওয়ায় এসব কারখানা চালু হয়নি। এটাকেই সংকট হিসেবে তুলে ধরেছে গ্রুপটি।



















