ঢাকা ০২:২২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চলনবিলের বুকে প্রাচীন বাণিজ্যকেন্দ্র চাটমোহরের ‘পুরাতন বাজার’

  • আপডেট সময় : ০৮:০২:০৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬
  • ১ বার পড়া হয়েছে

‘আমি ছেলেবেলায় কৃষ্ণনগরেই বাস করতুম সাড়ে এগারো মাস আর হরিপুরে পনেরো দিন। কিন্তু হরিপুর আমরা সঙ্গেই এনেছিলুম, তার মানসিক আবহাওয়াও।’ 

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম দিকপাল ও চলিত গদ্যরীতির রূপকার প্রমথ চৌধুরী তাঁর আত্মকথায় পৈতৃক নিবাস হরিপুর নিয়ে এভাবেই স্মৃতিচারণা করেছেন। গত ৯ সেপ্টেম্বর পাবনার চাটমোহর উপজেলায় প্রবেশের সময় তাঁর সেই মুগ্ধতার এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি যেন ধরা পড়ল চোখে। বাজারের অদূরেই প্রমথ চৌধুরীর সেই আদি নিবাস, যা একসময় ছিল এই অঞ্চলের অন্যতম সচ্ছল জমিদারি এলাকা। যে রূপে বিমোহিত হয়ে তিনি হরিপুরকে তাঁর লেখনীতে ধারণ করেছিলেন, সময়ের পালাবদলে তার জৌলুশ হয়তো কিছুটা ফিকে হয়েছে, তবে ঐতিহাসিক আভিজাত্যের সেই রেশ আজও অমলিন।

পাবনা জেলার মানচিত্রের দিকে তাকালে উত্তর-পশ্চিম কোণে যে জনপদটি সবচেয়ে বেশি ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক গাম্ভীর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তার নাম চাটমোহর। বৃহত্তর চলনবিলের কোল ঘেঁষে এবং এককালের প্রমত্ত বড়াল নদের তীরে গড়ে ওঠা এই জনপদ কেবল একটি সাধারণ উপজেলা নয়; এটি যেন শত শত বছরের বাণিজ্য, সাহিত্য আর নদীমাতৃক সভ্যতার এক জীবন্ত জাদুঘর। আর এই সুদীর্ঘ ইতিহাসের একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে আজও স্পন্দিত হচ্ছে চাটমোহরের ‘পুরাতন বাজার’। 

একসময় যে নদের ঘাটে নোঙর করত বড় বড় কার্গো লঞ্চ আর পালতোলা মহাজনি নৌকা, আজ সেই নদের বুকে পলি জমেছে, উঠেছে ইট-পাথরের দালানকোঠা। কিন্তু চাটমোহর পুরাতন বাজারের সেই চিরচেনা ব্যস্ততা, ব্যবসায়ীদের হাঁকডাক আর শতবর্ষী দালানগুলোর পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা অতীত আভিজাত্য আজও হারায়নি।

যেভাবে চাটমোহর ও তার বাজারের জন্ম 

একটি জনপদের নামের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে তার অতীত অর্থনীতির রূপরেখা। ঐতিহাসিক নথিপত্র ও আলেকজান্ডার কানিংহামের মতো প্রত্নতত্ত্ববিদদের বর্ণনা থেকে জানা যায়, প্রাচীনকাল থেকেই চলনবিল অঞ্চল ছিল এক উন্নত জনবসতি। যার প্রমাণ মেলে সম্প্রতি মাটি খুঁড়ে পাওয়া গুপ্তযুগের কষ্টিপাথরের বিষ্ণুমূর্তি থেকে। তবে চাটমোহরের বর্তমান বাণিজ্যিক রূপটি গড়ে ওঠে খ্রিষ্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দীতে।

সে সময় ধান, পাট, খেসারি ডাল, তিল ও মরিচের কেনাবেচার জন্য এটি ছিল চলনবিল অঞ্চলের সবচেয়ে বড় নৌবাণিজ্য কেন্দ্র। চারপাশের ৫৪টি নদ–নদী অধ্যুষিত চলনবিল থেকে ব্যবসায়ীরা আসতেন এখানে। কিন্তু নদীপথে ডাকাতদের প্রচণ্ড উপদ্রব ছিল। স্থানীয় জনশ্রুতি ও ঐতিহাসিকদের মতে, ডাকাতদের হাত থেকে রক্ষা পেতে দূরদূরান্ত থেকে আসা ক্রেতা-বিক্রেতারা স্বর্ণমুদ্রা বা ‘মোহর’ চটের থলিতে লুকিয়ে হাটে নিয়ে আসতেন। চটের থলিতে মোহর বেচাকেনার অভ্যাসের কারণেই কালক্রমে এলাকাটির নাম হয় ‘চাটমোহর’। পঞ্চদশ শতাব্দীতে এখানে একটি শক্তিশালী মুদ্রাভিত্তিক অর্থনীতি বিদ্যমান ছিল। সেই প্রাচীন বাণিজ্যের মূল কেন্দ্রটিই আজকের চাটমোহর পুরাতন বাজার।

হিন্দু বণিক ও বড়াল নদের যৌবন

চাটমোহরের পুরাতন বাজারের বিকাশ ঘটেছিল মূলত স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বী তিলি বা কুণ্ডু সম্প্রদায়ের হাত ধরে। ব্রিটিশ শাসনামলে নাটোর, পাবনা, ফরিদপুর ও সিরাজগঞ্জের মোকাম হিসেবে কাজ করত এ বাজার।

বাজারের এক প্রাচীন ভবনে বসে বিগত দিনের স্মৃতিচারণা করছিলেন সত্তরোর্ধ্ব মো. হাশেম আলী। বলছিলেন, ‘আজ থেকে ৫০ বছর আগেও আমরা এই বড়াল নদীতে কার্গো লঞ্চ আসতে দেখেছি। ৩০০-৪০০ মণ মালবাহী বড় বড় নৌকা তো আমাদের চোখের সামনেই তৈরি হতো এই
ঘাটে। তখন এ এলাকায় ধনাঢ্য হিন্দু ব্যবসায়ীদের বসবাস ছিল। 

স্থানীয় স্বর্ণ ব্যবসায়ী শ্রী জয়দেব কুণ্ডু বলেন, ‘আমি যে ঘরে বসে আছি, এটি প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো। কৃষ্ণদাস কুণ্ডু, সতীশ সাহা, রঘুনাথ কুণ্ডু, শিরিষ সাহাদের মতো বড় বড় ব্যবসায়ী ছিলেন। ভুসিমাল, গম, যব, চিনা, কাউনের বিশাল ব্যবসা ছিল তাঁদের, যা সরাসরি চাঁদপুরে চলে যেত নদীপথে।’

পরবর্তী সময়ে দেশভাগের পর এবং নানা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকেই ভারতে দেশান্তরিত হন। তবে সেই শূন্যস্থান ধীরে ধীরে পূরণ করেন স্থানীয় মুসলিম ও অন্য ব্যবসায়ীরা। 

এই বাজারের ব্যবসায়ীরা শুধু অর্থই উপার্জন করেননি, তা ব্যয় করেছেন জনকল্যাণেও। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ ১৯২৯ সালে নির্মিত ‘চাটমোহর দাতব্য চিকিৎসালয় গৃহ’। চিকিৎসালয়টির শিলালিপি বিশ্লেষণ করলে তৎকালীন সমাজব্যবস্থার এক অপূর্ব অসাম্প্রদায়িক চিত্র ফুটে ওঠে। 

পাবনা ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের চেয়ারম্যান মৌলভি ওয়াসিমুদ্দিন আহম্মাদ বাহাদুর এবং ভাইস চেয়ারম্যান এ এম আবদুল হামিদের পৃষ্ঠপোষকতায় এটি নির্মিত হলেও এর পেছনে সবচেয়ে বড় আর্থিক অবদান ছিল পুরাতন বাজারের কুণ্ডু পরিবারের। গিরিশচন্দ্র কুণ্ডু, রূপেন্দ্র নাথ কুণ্ডু, রঘুনাথ কুণ্ডু থেকে শুরু করে এই পরিবারের প্রায় ১৫ জন ব্যবসায়ী এবং হরিপুরের জমিদার ক্ষিতীশচন্দ্র চৌধুরী হাসপাতালটি নির্মাণে অর্থ দান করেছিলেন।

রেলের আগমন ও বাণিজ্যের পালাবদল

নদীমাতৃক অর্থনীতির পাশাপাশি ১৯১৫-১৯১৬ সালে ঈশ্বরদী-সিরাজগঞ্জ রেললাইন নির্মিত হলে চাটমোহরের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়। চাটমোহর রেলস্টেশন কলকাতাসহ বৃহত্তর বাংলার বাণিজ্যিক কেন্দ্রের সঙ্গে এই বাজারকে সরাসরি
যুক্ত করে। 

বর্তমানে নদের নাব্য না থাকলেও সড়ক ও রেল যোগাযোগের কারণে পুরাতন বাজারের গুরুত্ব কমেনি এতটুকু। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও চাটমোহর পৌরসভার হালনাগাদ তথ্যমতে, পৌরসভায় বর্তমানে প্রায় দুই হাজার বাণিজ্যিক বা ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু করা হয়েছে। পৌর এলাকায় মোট ১ হাজার ৫২৫টি দোকানের মধ্যে শুধু পুরাতন বাজারেই রয়েছে হাজারখানেক। খুচরা ও পাইকারি পণ্যের এক বিশাল হাব এটি। 

ব্যবসায়ী ও বাজার সমিতির কথা

অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা নিয়ে কথা হয় চাটমোহর পুরাতন বাজার বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শেখ মো. জিয়ারুল হকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘একসময় বড়াল নদই ছিল আমাদের বাজারের প্রাণ। চলনবিল অধ্যুষিত হান্ডিয়াল, ছাইকোলা, নিমাইচড়া এলাকার কৃষকদের উৎপাদিত ধান, পাট ও শীতকালীন সবজির সবচেয়ে বড় মোকাম আজও এই পুরাতন বাজার। এই বাজারের দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা। তবে বাজারের অবকাঠামোগত সমস্যা রয়ে গেছে।’ 

জিয়ারুল হক একটি চমকপ্রদ তথ্য দিয়ে বলেন, ব্রিটিশ আমলে ঈশ্বরদী-সিরাজগঞ্জ রেললাইনটি চাটমোহর পুরাতন বাজারের ওপর দিয়েই যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সে সময় ব্যবসায়ীরা ভয় পেয়েছিলেন এই ভেবে যে ট্রেন এলে বাণিজ্যের টাকা বা পণ্য সহজে ডাকাতি বা ছিনতাই হতে পারে। মূলত ব্যবসায়ীদের আপত্তির কারণে স্টেশনটি বাজার থেকে দূরে স্থাপন করা হয়, যা আজ রেলবাজার নামে পরিচিত।

পুরাতন বাজারের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির দোকান মনমোহন মিষ্টান্ন ভান্ডারের বর্তমান স্বত্বাধিকারী শ্রী কমল কুমার পাল বলেন, ‘আমাদের মিষ্টির সুনাম দেশজুড়ে। একসময় এই হাটে আসা জমিদার আর বড় মহাজনেরা আমাদের মূল ক্রেতা ছিলেন। এখন অনলাইনের যুগ, ঢাকা থেকেও মানুষ অর্ডার করেন। তবে কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় ঐতিহ্য ধরে রাখাটা বেশ কঠিন।’ 

একই বাজারে কৃষিপণ্যের পাইকারি ব্যবসায়ী আবদুর রহমান বলেন, আগে শুধু ধান-পাটের ব্যবসা হতো। এখন চাটমোহরের কৃষকেরা অনেক আধুনিক। ডিবিগ্রামের ‘মাল্টা ভাবি’খ্যাত শারমিন খাতুনের মতো কৃষকেরা এখন উচ্চমূল্যের বিদেশি ফল চাষ করছেন। সেসব ফল এখন আমাদের বাজারে আসছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে নতুন করে চাঙা করছে। 

শিল্পসাহিত্য ও সংস্কৃতির উর্বর ভূমি

চাটমোহরের এই অর্থনৈতিক প্রাচুর্য কেবল ইট-পাথরের দালানই তৈরি করেনি, জন্ম দিয়েছে উন্নত শিল্প ও সাহিত্যের। পুরাতন বাজারের কোলাহল আর চলনবিলের বিশালতা থেকেই প্রমথ চৌধুরী (বীরবল) বাংলা সাহিত্যে চলিত রীতির প্রবর্তন করেছিলেন। তাঁর পৈতৃক ভিটা হরিপুর গ্রাম এই চাটমোহরেই। ১৯১৪ সালে তাঁর সম্পাদিত সবুজ পত্র বাংলা সাহিত্যকে সংস্কৃতঘেঁষা সাধু ভাষা থেকে
মুক্ত করেছিল।

আবার এই চলনবিলের মাটি থেকেই উঠে এসেছেন অধ্যক্ষ এম এ হামিদ, যিনি চলনবিলের ইতিকথা লিখে এই জনপদের নৃতাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক ইতিহাসের এক অমূল্য দলিল রেখে গেছেন। ১৫৮১ সালে মোগল আমলে নির্মিত চাটমোহর শাহি মসজিদ প্রমাণ করে যে নৌবন্দর হিসেবে এর গুরুত্ব অনুধাবন করেই এখানে এত সুবিশাল ধর্মীয় স্থাপনা নির্মিত হয়েছিল। 

নদ রক্ষার সংগ্রাম ও আগামীর চ্যালেঞ্জ

যে বড়াল নদ পুরাতন বাজারকে জীবন দিয়েছিল, অপরিকল্পিত স্লুইসগেট আর দখলের কারণে সেই নদ আজ মৃতপ্রায়। তবে আশার কথা, স্থানীয় জনগণ ও ব্যবসায়ীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা বড়াল রক্ষা আন্দোলনের ফলে সরকার ইতিমধ্যে কিছু বাঁধ অপসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। কুমারগাড়া গ্রামে নদতীরে পরিবেশবান্ধব বড়াল বিদ্যানিকেতন গড়ে তুলে আগামী প্রজন্মকে প্রকৃতির প্রতি সংবেদনশীল করার কাজও চলছে।

চাটমোহরের পুরাতন বাজারের অলিগলি হাঁটলে এখনো নাকে আসে পাটের সোঁদা গন্ধ, চোখে পড়ে শতবর্ষী পুরোনো দালানের খসে পড়া পলেস্তারা। আর শোনা যায় শত শত মানুষের জীবন-জীবিকার কোলাহল। চটের বস্তায় এখন আর সোনার মোহর আসে না ঠিকই, তবে চলনবিলের কৃষকের ঘামে বোনা সোনালি ফসল আর ব্যবসায়ীদের নিরলস পরিশ্রমে আজও চাটমোহর পুরাতন বাজার পাবনা জেলার অর্থনীতির এক মুকুটহীন সম্রাট হয়েই টিকে আছে। নদ বাঁচলে, এই বাজার বাঁচবে—আর এই বাজার বাঁচলেই টিকে থাকবে চলনবিলের হাজার বছরের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস।

ট্যাগস :

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

চলনবিলের বুকে প্রাচীন বাণিজ্যকেন্দ্র চাটমোহরের ‘পুরাতন বাজার’

আপডেট সময় : ০৮:০২:০৩ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১ অক্টোবর ২০২৬

‘আমি ছেলেবেলায় কৃষ্ণনগরেই বাস করতুম সাড়ে এগারো মাস আর হরিপুরে পনেরো দিন। কিন্তু হরিপুর আমরা সঙ্গেই এনেছিলুম, তার মানসিক আবহাওয়াও।’ 

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম দিকপাল ও চলিত গদ্যরীতির রূপকার প্রমথ চৌধুরী তাঁর আত্মকথায় পৈতৃক নিবাস হরিপুর নিয়ে এভাবেই স্মৃতিচারণা করেছেন। গত ৯ সেপ্টেম্বর পাবনার চাটমোহর উপজেলায় প্রবেশের সময় তাঁর সেই মুগ্ধতার এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি যেন ধরা পড়ল চোখে। বাজারের অদূরেই প্রমথ চৌধুরীর সেই আদি নিবাস, যা একসময় ছিল এই অঞ্চলের অন্যতম সচ্ছল জমিদারি এলাকা। যে রূপে বিমোহিত হয়ে তিনি হরিপুরকে তাঁর লেখনীতে ধারণ করেছিলেন, সময়ের পালাবদলে তার জৌলুশ হয়তো কিছুটা ফিকে হয়েছে, তবে ঐতিহাসিক আভিজাত্যের সেই রেশ আজও অমলিন।

পাবনা জেলার মানচিত্রের দিকে তাকালে উত্তর-পশ্চিম কোণে যে জনপদটি সবচেয়ে বেশি ঐতিহাসিক ও অর্থনৈতিক গাম্ভীর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, তার নাম চাটমোহর। বৃহত্তর চলনবিলের কোল ঘেঁষে এবং এককালের প্রমত্ত বড়াল নদের তীরে গড়ে ওঠা এই জনপদ কেবল একটি সাধারণ উপজেলা নয়; এটি যেন শত শত বছরের বাণিজ্য, সাহিত্য আর নদীমাতৃক সভ্যতার এক জীবন্ত জাদুঘর। আর এই সুদীর্ঘ ইতিহাসের একেবারে কেন্দ্রবিন্দুতে আজও স্পন্দিত হচ্ছে চাটমোহরের ‘পুরাতন বাজার’। 

একসময় যে নদের ঘাটে নোঙর করত বড় বড় কার্গো লঞ্চ আর পালতোলা মহাজনি নৌকা, আজ সেই নদের বুকে পলি জমেছে, উঠেছে ইট-পাথরের দালানকোঠা। কিন্তু চাটমোহর পুরাতন বাজারের সেই চিরচেনা ব্যস্ততা, ব্যবসায়ীদের হাঁকডাক আর শতবর্ষী দালানগুলোর পরতে পরতে লুকিয়ে থাকা অতীত আভিজাত্য আজও হারায়নি।

যেভাবে চাটমোহর ও তার বাজারের জন্ম 

একটি জনপদের নামের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে তার অতীত অর্থনীতির রূপরেখা। ঐতিহাসিক নথিপত্র ও আলেকজান্ডার কানিংহামের মতো প্রত্নতত্ত্ববিদদের বর্ণনা থেকে জানা যায়, প্রাচীনকাল থেকেই চলনবিল অঞ্চল ছিল এক উন্নত জনবসতি। যার প্রমাণ মেলে সম্প্রতি মাটি খুঁড়ে পাওয়া গুপ্তযুগের কষ্টিপাথরের বিষ্ণুমূর্তি থেকে। তবে চাটমোহরের বর্তমান বাণিজ্যিক রূপটি গড়ে ওঠে খ্রিষ্টীয় পঞ্চদশ শতাব্দীতে।

সে সময় ধান, পাট, খেসারি ডাল, তিল ও মরিচের কেনাবেচার জন্য এটি ছিল চলনবিল অঞ্চলের সবচেয়ে বড় নৌবাণিজ্য কেন্দ্র। চারপাশের ৫৪টি নদ–নদী অধ্যুষিত চলনবিল থেকে ব্যবসায়ীরা আসতেন এখানে। কিন্তু নদীপথে ডাকাতদের প্রচণ্ড উপদ্রব ছিল। স্থানীয় জনশ্রুতি ও ঐতিহাসিকদের মতে, ডাকাতদের হাত থেকে রক্ষা পেতে দূরদূরান্ত থেকে আসা ক্রেতা-বিক্রেতারা স্বর্ণমুদ্রা বা ‘মোহর’ চটের থলিতে লুকিয়ে হাটে নিয়ে আসতেন। চটের থলিতে মোহর বেচাকেনার অভ্যাসের কারণেই কালক্রমে এলাকাটির নাম হয় ‘চাটমোহর’। পঞ্চদশ শতাব্দীতে এখানে একটি শক্তিশালী মুদ্রাভিত্তিক অর্থনীতি বিদ্যমান ছিল। সেই প্রাচীন বাণিজ্যের মূল কেন্দ্রটিই আজকের চাটমোহর পুরাতন বাজার।

হিন্দু বণিক ও বড়াল নদের যৌবন

চাটমোহরের পুরাতন বাজারের বিকাশ ঘটেছিল মূলত স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বী তিলি বা কুণ্ডু সম্প্রদায়ের হাত ধরে। ব্রিটিশ শাসনামলে নাটোর, পাবনা, ফরিদপুর ও সিরাজগঞ্জের মোকাম হিসেবে কাজ করত এ বাজার।

বাজারের এক প্রাচীন ভবনে বসে বিগত দিনের স্মৃতিচারণা করছিলেন সত্তরোর্ধ্ব মো. হাশেম আলী। বলছিলেন, ‘আজ থেকে ৫০ বছর আগেও আমরা এই বড়াল নদীতে কার্গো লঞ্চ আসতে দেখেছি। ৩০০-৪০০ মণ মালবাহী বড় বড় নৌকা তো আমাদের চোখের সামনেই তৈরি হতো এই
ঘাটে। তখন এ এলাকায় ধনাঢ্য হিন্দু ব্যবসায়ীদের বসবাস ছিল। 

স্থানীয় স্বর্ণ ব্যবসায়ী শ্রী জয়দেব কুণ্ডু বলেন, ‘আমি যে ঘরে বসে আছি, এটি প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো। কৃষ্ণদাস কুণ্ডু, সতীশ সাহা, রঘুনাথ কুণ্ডু, শিরিষ সাহাদের মতো বড় বড় ব্যবসায়ী ছিলেন। ভুসিমাল, গম, যব, চিনা, কাউনের বিশাল ব্যবসা ছিল তাঁদের, যা সরাসরি চাঁদপুরে চলে যেত নদীপথে।’

পরবর্তী সময়ে দেশভাগের পর এবং নানা রাজনৈতিক পটপরিবর্তনে হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকেই ভারতে দেশান্তরিত হন। তবে সেই শূন্যস্থান ধীরে ধীরে পূরণ করেন স্থানীয় মুসলিম ও অন্য ব্যবসায়ীরা। 

এই বাজারের ব্যবসায়ীরা শুধু অর্থই উপার্জন করেননি, তা ব্যয় করেছেন জনকল্যাণেও। এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ ১৯২৯ সালে নির্মিত ‘চাটমোহর দাতব্য চিকিৎসালয় গৃহ’। চিকিৎসালয়টির শিলালিপি বিশ্লেষণ করলে তৎকালীন সমাজব্যবস্থার এক অপূর্ব অসাম্প্রদায়িক চিত্র ফুটে ওঠে। 

পাবনা ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের চেয়ারম্যান মৌলভি ওয়াসিমুদ্দিন আহম্মাদ বাহাদুর এবং ভাইস চেয়ারম্যান এ এম আবদুল হামিদের পৃষ্ঠপোষকতায় এটি নির্মিত হলেও এর পেছনে সবচেয়ে বড় আর্থিক অবদান ছিল পুরাতন বাজারের কুণ্ডু পরিবারের। গিরিশচন্দ্র কুণ্ডু, রূপেন্দ্র নাথ কুণ্ডু, রঘুনাথ কুণ্ডু থেকে শুরু করে এই পরিবারের প্রায় ১৫ জন ব্যবসায়ী এবং হরিপুরের জমিদার ক্ষিতীশচন্দ্র চৌধুরী হাসপাতালটি নির্মাণে অর্থ দান করেছিলেন।

রেলের আগমন ও বাণিজ্যের পালাবদল

নদীমাতৃক অর্থনীতির পাশাপাশি ১৯১৫-১৯১৬ সালে ঈশ্বরদী-সিরাজগঞ্জ রেললাইন নির্মিত হলে চাটমোহরের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়। চাটমোহর রেলস্টেশন কলকাতাসহ বৃহত্তর বাংলার বাণিজ্যিক কেন্দ্রের সঙ্গে এই বাজারকে সরাসরি
যুক্ত করে। 

বর্তমানে নদের নাব্য না থাকলেও সড়ক ও রেল যোগাযোগের কারণে পুরাতন বাজারের গুরুত্ব কমেনি এতটুকু। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও চাটমোহর পৌরসভার হালনাগাদ তথ্যমতে, পৌরসভায় বর্তমানে প্রায় দুই হাজার বাণিজ্যিক বা ট্রেড লাইসেন্স ইস্যু করা হয়েছে। পৌর এলাকায় মোট ১ হাজার ৫২৫টি দোকানের মধ্যে শুধু পুরাতন বাজারেই রয়েছে হাজারখানেক। খুচরা ও পাইকারি পণ্যের এক বিশাল হাব এটি। 

ব্যবসায়ী ও বাজার সমিতির কথা

অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা নিয়ে কথা হয় চাটমোহর পুরাতন বাজার বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শেখ মো. জিয়ারুল হকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘একসময় বড়াল নদই ছিল আমাদের বাজারের প্রাণ। চলনবিল অধ্যুষিত হান্ডিয়াল, ছাইকোলা, নিমাইচড়া এলাকার কৃষকদের উৎপাদিত ধান, পাট ও শীতকালীন সবজির সবচেয়ে বড় মোকাম আজও এই পুরাতন বাজার। এই বাজারের দৈনিক লেনদেনের পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা। তবে বাজারের অবকাঠামোগত সমস্যা রয়ে গেছে।’ 

জিয়ারুল হক একটি চমকপ্রদ তথ্য দিয়ে বলেন, ব্রিটিশ আমলে ঈশ্বরদী-সিরাজগঞ্জ রেললাইনটি চাটমোহর পুরাতন বাজারের ওপর দিয়েই যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সে সময় ব্যবসায়ীরা ভয় পেয়েছিলেন এই ভেবে যে ট্রেন এলে বাণিজ্যের টাকা বা পণ্য সহজে ডাকাতি বা ছিনতাই হতে পারে। মূলত ব্যবসায়ীদের আপত্তির কারণে স্টেশনটি বাজার থেকে দূরে স্থাপন করা হয়, যা আজ রেলবাজার নামে পরিচিত।

পুরাতন বাজারের ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির দোকান মনমোহন মিষ্টান্ন ভান্ডারের বর্তমান স্বত্বাধিকারী শ্রী কমল কুমার পাল বলেন, ‘আমাদের মিষ্টির সুনাম দেশজুড়ে। একসময় এই হাটে আসা জমিদার আর বড় মহাজনেরা আমাদের মূল ক্রেতা ছিলেন। এখন অনলাইনের যুগ, ঢাকা থেকেও মানুষ অর্ডার করেন। তবে কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় ঐতিহ্য ধরে রাখাটা বেশ কঠিন।’ 

একই বাজারে কৃষিপণ্যের পাইকারি ব্যবসায়ী আবদুর রহমান বলেন, আগে শুধু ধান-পাটের ব্যবসা হতো। এখন চাটমোহরের কৃষকেরা অনেক আধুনিক। ডিবিগ্রামের ‘মাল্টা ভাবি’খ্যাত শারমিন খাতুনের মতো কৃষকেরা এখন উচ্চমূল্যের বিদেশি ফল চাষ করছেন। সেসব ফল এখন আমাদের বাজারে আসছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতিকে নতুন করে চাঙা করছে। 

শিল্পসাহিত্য ও সংস্কৃতির উর্বর ভূমি

চাটমোহরের এই অর্থনৈতিক প্রাচুর্য কেবল ইট-পাথরের দালানই তৈরি করেনি, জন্ম দিয়েছে উন্নত শিল্প ও সাহিত্যের। পুরাতন বাজারের কোলাহল আর চলনবিলের বিশালতা থেকেই প্রমথ চৌধুরী (বীরবল) বাংলা সাহিত্যে চলিত রীতির প্রবর্তন করেছিলেন। তাঁর পৈতৃক ভিটা হরিপুর গ্রাম এই চাটমোহরেই। ১৯১৪ সালে তাঁর সম্পাদিত সবুজ পত্র বাংলা সাহিত্যকে সংস্কৃতঘেঁষা সাধু ভাষা থেকে
মুক্ত করেছিল।

আবার এই চলনবিলের মাটি থেকেই উঠে এসেছেন অধ্যক্ষ এম এ হামিদ, যিনি চলনবিলের ইতিকথা লিখে এই জনপদের নৃতাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক ইতিহাসের এক অমূল্য দলিল রেখে গেছেন। ১৫৮১ সালে মোগল আমলে নির্মিত চাটমোহর শাহি মসজিদ প্রমাণ করে যে নৌবন্দর হিসেবে এর গুরুত্ব অনুধাবন করেই এখানে এত সুবিশাল ধর্মীয় স্থাপনা নির্মিত হয়েছিল। 

নদ রক্ষার সংগ্রাম ও আগামীর চ্যালেঞ্জ

যে বড়াল নদ পুরাতন বাজারকে জীবন দিয়েছিল, অপরিকল্পিত স্লুইসগেট আর দখলের কারণে সেই নদ আজ মৃতপ্রায়। তবে আশার কথা, স্থানীয় জনগণ ও ব্যবসায়ীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে গড়ে ওঠা বড়াল রক্ষা আন্দোলনের ফলে সরকার ইতিমধ্যে কিছু বাঁধ অপসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। কুমারগাড়া গ্রামে নদতীরে পরিবেশবান্ধব বড়াল বিদ্যানিকেতন গড়ে তুলে আগামী প্রজন্মকে প্রকৃতির প্রতি সংবেদনশীল করার কাজও চলছে।

চাটমোহরের পুরাতন বাজারের অলিগলি হাঁটলে এখনো নাকে আসে পাটের সোঁদা গন্ধ, চোখে পড়ে শতবর্ষী পুরোনো দালানের খসে পড়া পলেস্তারা। আর শোনা যায় শত শত মানুষের জীবন-জীবিকার কোলাহল। চটের বস্তায় এখন আর সোনার মোহর আসে না ঠিকই, তবে চলনবিলের কৃষকের ঘামে বোনা সোনালি ফসল আর ব্যবসায়ীদের নিরলস পরিশ্রমে আজও চাটমোহর পুরাতন বাজার পাবনা জেলার অর্থনীতির এক মুকুটহীন সম্রাট হয়েই টিকে আছে। নদ বাঁচলে, এই বাজার বাঁচবে—আর এই বাজার বাঁচলেই টিকে থাকবে চলনবিলের হাজার বছরের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস।